মহাকাব্য ও মহাকাব্য পরিচিতি

Any Akter
কর্নেল আবদুল মোক্তাদের, এমফিল, পিএইচডি
প্রকাশিত: ১২:২৪ অপরাহ্ন, ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৭:৩৭ অপরাহ্ন, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
ছবিঃ এআই
ছবিঃ এআই

ভূমিকা

মানুষের AšÍwb©wnZ অনুভূতি, কল্পনা, আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা যখন ছন্দময় ও শিল্পসম্মত ভাষায় প্রকাশিত হয়, তখনই কবিতার জন্ম ঘটে। মানবসভ্যতার প্রাথমিক পর্যায়ে লিখিত ভাষার প্রচলন সীমিত থাকলেও মানুষ তার বীরত্ব, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক অভিজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক স্মৃতিকে ছন্দোবদ্ধ ভাষায় সংরক্ষণ করত। এভাবেই পৃথিবীর প্রায় সব ভাষার সাহিত্যে কবিতার মাধ্যমে সাহিত্যিক বিকাশের সূচনা ঘটে। পরবর্তীকালে সেই কবিতারই একটি ব্যাপক, বর্ণনামূলক ও বীরত্বনির্ভর রূপ হিসেবে মহাকাব্যের আবির্ভাব হয়। আরবি সাহিত্যও এই সাধারণ সাহিত্যিক বিবর্তনের বাইরে নয়। মরুভূমির যাযাবর আরবদের জীবন ছিল সংগ্রাম, যুদ্ধ, অভিযান, গোত্রীয় মর্যাদা, ভ্রমণ, আতিথেয়তা, প্রতিশোধ এবং বীরত্বের নানা ঘটনায় পরিপূর্ণ। এসব অভিজ্ঞতা তাদের মৌখিক কবিতায় প্রতিফলিত হতো। ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবি কবিতা ভাষাগত সৌন্দর্য, অলংকার, ছন্দ, কল্পনা ও বিষয়বৈচিত্র্যে অসাধারণ উৎকর্ষ লাভ করে। তবে আরবি কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর আবেগময় প্রকাশ; গ্রিক বা ভারত বর্ষের সাহিত্যের মতো দীর্ঘ ও সুবিন্যস্ত মহাকাব্যিক আখ্যান সেখানে তেমন বিকশিত হয়নি।

আরও পড়ুন: এলপিজি বাজারে স্থিতিশীলতা: প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

ইসলামের আগমনের পর আরবি সাহিত্যে এক নতুন আদর্শিক ও নৈতিক চেতনার সঞ্চার ঘটে। কুরআন ও হাদিসের প্রভাব, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন যুদ্ধ, বিজয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মুসলিম সমাজের বিকাশ আরবি সাহিত্যের বিষয়বস্তুকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত করে। পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য সাহিত্য, অনুবাদ-আন্দোলন এবং আধুনিক জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রভাবে আরবি কবিগণ দীর্ঘ আখ্যানমূলক ও মহাকাব্যিক রচনার প্রতি আগ্রহী হন।

মহাকাব্য কোনো জাতির সম্মিলিত স্মৃতি, বীরত্ব, আদর্শ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক চেতনাকে শিল্পরূপে ধারণ করে। তাই বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে মহাকাব্যের গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক। এই প্রবন্ধে মহাকাব্যের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, উৎপত্তি, বিশ্বসাহিত্যে এর বিকাশ এবং বিশেষত আরবি সাহিত্যে মহাকাব্যের অবস্থান আলোচনা করা হবে। সর্বশেষে মিশরীয় কবি আহমদ মুহাররমের বিখ্যাত রচনা ‘দিওয়ান মাজদিল ইসলাম’-এর ওপর বিশেষ আলোকপাত করা হবে।

আরও পড়ুন: সমৃদ্ধির স্বপ্নে স্থবিরতা: বাংলাদেশের অর্থনীত

মহাকাব্যের সংজ্ঞা

মহাকাব্যের ইংরেজি প্রতিশব্দ Epic। শব্দটি গ্রিক epikos থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ গান, বর্ণনা বা বক্তৃতা। আরবি ভাষায় মহাকাব্যের প্রতিশব্দ হলো মালহামা । এটি সাধারণত এমন দীর্ঘ আখ্যানমূলক কাব্যকে বোঝায়, যেখানে কোনো বীর, জাতি, ঐতিহাসিক ঘটনা, ধর্মীয় আদর্শ বা গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামকে মহিমান্বিত ও শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপন করা হয়। মহাকাব্যের সংজ্ঞা সম্পর্কে বিভিন্ন সাহিত্যিক ও সমালোচক বিভিন্ন মতামত প্রদান করেছেন। ড. মুহাম্মদ মানযুরের মতে, মহাকাব্য হলো এমন এক বীরোচিত কাব্য-কাহিনি, যেখানে অলৌকিক ঘটনা, রূপকথা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক উপাদানের সমন্বয় ঘটে। তাঁর সংজ্ঞায় মহাকাব্যের কল্পনাপ্রবণ ও অতিমানবিক বৈশিষ্ট্যটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

আহমদ কাব্বিশের মতে, মহাকাব্য হলো যোদ্ধাদের বীরত্ব, কল্পনা এবং দীর্ঘ ঐতিহাসিক ঘটনাসমৃদ্ধ একটি সুদীর্ঘ কাসিদা বা আখ্যানমূলক কবিতা। এতে যুদ্ধ, বীরত্ব, সংঘর্ষ, বিজয় এবং জাতিগত গৌরবের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। 

অন্যদিকে ড. আহমদ আমিন তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা প্রদান করে বলেন, যে কাসিদা কোনো কাহিনিকে কেন্দ্র করে রচিত হয়, তাকেই মহাকাব্য বলা যায়।

আহমদ হাসান আয-যায়্যাতের মতে, গল্পের আকারে কোনো জাতির কৃতিত্ব, যুদ্ধ এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলি বর্ণনা করাই মহাকাব্যের মূল উদ্দেশ্য। এ সংজ্ঞায় মহাকাব্যের জাতীয় ও ঐতিহাসিক চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পাশ্চাত্য সাহিত্যেও মহাকাব্যের অনুরূপ সংজ্ঞা পাওয়া যায়। Oxford Dictionary অনুসারে, মহাকাব্য হলো একটি দীর্ঘ কবিতা, যা প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত এবং কোনো বীর বা জাতির ইতিহাস ও কীর্তি বর্ণনা করে। Merriam-Webster Dictionary মহাকাব্যকে এমন একটি দীর্ঘ আখ্যানমূলক কবিতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে, যা উন্নত ও গম্ভীর শৈলীতে রচিত এবং কোনো কিংবদন্তি বা ঐতিহাসিক নায়কের বীরত্বপূর্ণ কর্মের বিবরণ প্রদান করে।

গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল মহাকাব্যকে একটি সম্পূর্ণ, ঐক্যবদ্ধ ও সুসংবদ্ধ কার্যক্রমসম্পন্ন আখ্যান হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁর মতে, মহাকাব্যে ঘটনাবলির মধ্যে ঐক্য, ধারাবাহিকতা এবং একটি কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য থাকা আবশ্যক। 

বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “কালে কালে একটি সমগ্র জাতি যে কাব্যকে একজন কবির কবিত্বশক্তি আশ্রয় করিয়া রচনা করিয়া তুলিয়াছে, তাহাকেই যথার্থ মহাকাব্য বলা হয়।”

উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করলে মহাকাব্যের কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যায়। এগুলো হলো—

১. এটি দীর্ঘ ও বিস্তৃত আখ্যানমূলক কাব্য।

২. এতে বীর, নায়ক বা কোনো জাতীয় চরিত্রের উপস্থিতি থাকে।

৩. বিষয়বস্তু সাধারণত ঐতিহাসিক, ধর্মীয়, পৌরাণিক বা কিংবদন্তিনির্ভর হয়।

৪. ভাষা ও শৈলী হয় গম্ভীর, উন্নত, অলংকারসমৃদ্ধ এবং মহিমান্বিত।

৫. এতে ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে জাতীয়, সামাজিক বা আদর্শিক চেতনা অধিক গুরুত্ব পায়।

৬. ঘটনাবলির মধ্যে ধারাবাহিকতা, ঐক্য এবং নাটকীয় উত্তেজনা থাকে।

৭. অনেক মহাকাব্যে অতিপ্রাকৃত শক্তি, দেবদেবী, ফেরেশতা, অলৌকিক ঘটনা বা ভাগ্যের প্রভাব দেখা যায়।

সুতরাং মহাকাব্য কেবল দীর্ঘ কবিতা নয়, বরং এটি কোনো জাতির সম্মিলিত চেতনা ও ঐতিহাসিক স্মৃতির একটি মহিমান্বিত সাহিত্যিক রূপ।

বিশ্বসাহিত্যে মহাকাব্যের উৎপত্তি ও বিকাশ

মহাকাব্যের উৎপত্তি মানবসভ্যতার প্রাচীনতম সাহিত্যিক পর্যায়ে। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের কাছাকাছি সময়ে মহাকাব্যধারার সূচনা ঘটে। সর্বপ্রাচীন পরিচিত মহাকাব্য হলো সুমেরীয় ‘গিলগামেশ’ মহাকাব্য । এতে উরুকের রাজা গিলগামেশের বীরত্ব, বন্ধুত্ব, অভিযান, মৃত্যু-চেতনা এবং অমরত্বের সন্ধানের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এই মহাকাব্যে মানবজীবনের সীমাবদ্ধতা ও চিরস্থায়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা গভীর দার্শনিক তাৎপর্য লাভ করেছে।

গ্রিক সাহিত্যে মহাকাব্য সর্বোচ্চ উৎকর্ষ লাভ করে কবি হোমারের হাতে। তাঁর দুটি অমর সৃষ্টি হলো ‘ইলিয়াড’  ও ‘ওডিসি’ । ‘ইলিয়াড’-এ ট্রয় যুদ্ধের কাহিনি, বিশেষত বীর অ্যাকিলিসের ক্রোধ, বীরত্ব, সম্মানবোধ ও যুদ্ধজীবন বর্ণিত হয়েছে। এতে প্রায় ১৫,৬৯৩টি চরণ রয়েছে। অন্যদিকে ‘ওডিসি ’ তে ট্রয় যুদ্ধ শেষে ওডিসিয়াসের দীর্ঘ ও বিপদসংকুল স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কাহিনি উপস্থাপিত হয়েছে। হোমারের এই দুটি মহাকাব্য পরবর্তী ইউরোপীয় সাহিত্যের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে।

রোমান সাহিত্যে ভার্জিলের ‘ইনিড ’ অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য। এতে ট্রয় থেকে আগত বীর এনিয়াসের মাধ্যমে রোমান জাতির ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক উৎস ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটি শুধু একটি বীরত্বগাথা নয়; বরং রোমান সাম্রাজ্যের জাতীয় গৌরব, রাষ্ট্রচেতনা এবং ঐতিহাসিক বৈধতার সাহিত্যিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

পারস্য সাহিত্যে আবুল কাসিম ফেরদৌসীর ‘শাহনামা ’ মহাকাব্যধারার একটি অনন্য নিদর্শন। প্রায় ষাট হাজার চরণে রচিত এই মহাকাব্যে প্রাচীন ইরানের রাজা, বীর, যুদ্ধ, সংস্কৃতি, নৈতিকতা এবং জাতীয় ইতিহাসের বিশাল বিবরণ পাওয়া যায়। ‘শাহনামা ’ পারস্য জাতির ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় সংরক্ষণে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে।

ভারত বর্ষের সাহিত্যে বাল্মীকির  ‘রামায়ণ ’ ও  বেদব্যাসের ‘মহাভারত ’ মহাকাব্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। ‘রামায়ণ ’-এ রামচন্দ্রের আদর্শ, ন্যায়, কর্তব্য ও সংগ্রামের কাহিনি এবং ‘মহাভারত’-এ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, ধর্ম-অধর্মের দ্বন্দ্ব ও মানবজীবনের জটিলতা বর্ণিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ ’ কাব্য  পাশ্চাত্য মহাকাব্যিক রীতির প্রভাবে রচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক মহাকাব্য।

মহাকাব্যকে বিষয় ও রচনাশৈলীর ভিত্তিতে সাধারণত কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন,

1. ঐতিহাসিক মহাকাব্য: কোনো জাতি বা রাষ্ট্রের ইতিহাস ও বীরত্বের ওপর ভিত্তি করে রচিত।

2. ধর্মীয় বা পৌরাণিক মহাকাব্য: ধর্মীয় বিশ্বাস, দেব- দেবী, নবী, পৌরাণিক চরিত্র বা আধ্যাত্মিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে রচিত।

3. সাহিত্যিক বা কল্পনাপ্রধান মহাকাব্য: কল্পনা, কিংবদন্তি ও অলৌকিক উপাদাননির্ভর রচনা।

4. জাতীয় মহাকাব্য: কোনো জাতির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য ও জাতীয় গৌরবকে কেন্দ্র করে রচিত মহাকাব্য।

আরবি সাহিত্যে মহাকাব্যের অবস্থান

প্রাচীন আরবি সাহিত্যে শাস্ত্রীয় অর্থে মহাকাব্যের অস্তিত্ব খুব সীমিত ছিল। জাহেলিয়া যুগের আরবরা বীরত্ব, যুদ্ধ, গোত্রীয় সংঘর্ষ, প্রেম, প্রতিশোধ, আতিথেয়তা ও মর্যাদাবোধকে কেন্দ্র করে অসংখ্য কবিতা রচনা করলেও সেগুলো সাধারণত দীর্ঘ আখ্যানের পরিবর্তে বিচ্ছিন্ন কাসিদা বা সংক্ষিপ্ত বর্ণনামূলক কবিতার আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এর প্রধান কারণ ছিল আরবদের মৌখিক সাহিত্যিক ঐতিহ্য। মরুভূমির জীবন, যাযাবর সংস্কৃতি এবং মুখস্থনির্ভর সাহিত্যচর্চার কারণে দীর্ঘ ও সুবিন্যস্ত মহাকাব্য রচনার পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত, ছন্দোবদ্ধ ও সহজে স্মরণযোগ্য কবিতা বেশি জনপ্রিয় ছিল। ফলে আরবি সাহিত্যে গ্রিক ‘ইলিয়াড’, ভারত বর্ষের ‘মহাভারত ’ বা পারস্যের ‘শাহনামা ’-র মতো প্রাচীন শাস্ত্রীয় মহাকাব্য গড়ে ওঠেনি। তবে আরবি সাহিত্যে মহাকাব্যিক উপাদানের অভাব ছিল না। জাহেলিয়া যুগের গোত্রীয় যুদ্ধ, ইসলামি বিজয়, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, সাহাবিদের বীরত্ব এবং মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তারের মধ্যে মহাকাব্য রচনার অসংখ্য উপাদান বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এসব উপাদান অধিকাংশ ক্ষেত্রে সীরাত, মাগাজি, ইতিহাস, কিসসা বা মৌখিক লোকগাথার আকারে সংরক্ষিত হয়েছে।

আরবি লোকসাহিত্যে ‘সীরাতু আনতার’, ‘সীরাতু বনি হিলাল’, ‘সীরাতু সাইফ ইবনু যি ইয়াযান ’ প্রভৃতি দীর্ঘ আখ্যান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এগুলোতে বীরত্ব, যুদ্ধ, প্রেম, অভিযান, অতিপ্রাকৃত ঘটনা ও কল্পনার সমন্বয় দেখা যায়। তবে এগুলো শাস্ত্রীয় মহাকাব্যের তুলনায় লোকমহাকাব্য বা বীরগাথামূলক আখ্যান হিসেবে অধিক পরিচিত। আধুনিক যুগে পাশ্চাত্য সাহিত্য ও অনুবাদ-আন্দোলনের প্রভাবে আরবি কবিরা মহাকাব্য রচনায় নতুনভাবে আগ্রহী হন। ১৯০৩ সালে লেবাননি কবি সুলাইমান আল-বুস্তানি হোমারের ‘ইলিয়াড ’  আরবি ভাষায় অনুবাদ করেন। এই অনুবাদ আরবি সাহিত্যিকদের মধ্যে মহাকাব্যিক রচনার সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নতুন সচেতনতা সৃষ্টি করে। পরবর্তীকালে আলি আহমদ বাকাছির হজরত উমর (রা.) এর জীবন অবলম্বনে মহাকাব্যিক রচনা করেন। তবে আধুনিক আরবি সাহিত্যে ইসলামি ইতিহাসকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাকাব্যিক প্রয়াস হলো আহমদ মুহাররমের ‘দিওয়ান মাজদিল ইসলাম’ ।

আহমদ মুহাররমের দিওয়ান মাজদিল ইসলাম

আহমদ মুহাররম (১৮৭৭–১৯৪৫) ছিলেন মিশরের একজন বিশিষ্ট কবি, জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ এবং ইসলামি চেতনার প্রবক্তা। তিনি আরবি নব্য-ধ্রুপদী কবিতাধারার অন্যতম প্রতিনিধি। তাঁর কবিতায় জাতীয় মর্যাদা, ইসলামি ঐক্য, ধর্মীয় আদর্শ, নৈতিকতা, বীরত্ব এবং মুসলিম উম্মাহর গৌরব বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ রচনা হলো ‘দিওয়ান মাজদিল ইসলাম’ বাংলায় যার অর্থ ‘ইসলামের গৌরবের কাব্যগ্রন্থ’ । এটি আরবি সাহিত্যে ‘ইসলামি ইলিয়াড’ নামে পরিচিত। এই নামকরণ থেকেই বোঝা যায় যে, কবি ইসলামি ইতিহাসকে হোমারের মহাকাব্যিক ঐতিহ্যের সঙ্গে তুলনীয় মর্যাদায় উপস্থাপন করতে চেয়েছেন।

এই কাব্যে নবী মুহাম্মদ (সা.) এর নবুওয়াতপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে তাঁর ওফাত পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি কালানুক্রমিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। এতে মক্কি জীবনের নির্যাতন, ইসলাম গ্রহণ, হিজরত, মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন গাজওয়া, রাজনৈতিক চুক্তি, সামাজিক সংস্কার, ধর্মীয় শিক্ষা এবং মুসলিম সমাজের বিকাশের বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে। কবি ঘটনাগুলোকে নিছক ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং এগুলোকে বীরত্ব, আত্মত্যাগ, ন্যায়, ঈমান, নেতৃত্ব ও আদর্শিক সংগ্রামের মহিমান্বিত কাব্যিক রূপ দিয়েছেন।

‘দিওয়ান মাজদিল ইসলাম’ এ রাসূলুল্লাহ (সা.) কে কেবল একজন ঐতিহাসিক নেতা হিসেবে নয়, বরং মানবজাতির পথপ্রদর্শক, ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী, চৌকশ সামরিক নেতা এবং নৈতিক আদর্শের প্রতীক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামও এখানে জাতীয় ও ধর্মীয় ইতিহাসের চিরন্তন বীর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যুদ্ধের বর্ণনায় সামরিক কৌশল, সাহস, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ এবং ঈমানি দৃঢ়তার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করতেন, যেমন ফেরদৌসী পারস্যের ইতিহাসকে ‘শাহনামা’-য় এবং হোমার গ্রিক বীরত্বকে ‘ইলিয়াড’-এ অমর করে তুলেছেন, তেমনি ইসলামি ইতিহাস ও মুসলিম জাতির গৌরবকেও একটি মহাকাব্যিক রচনায় ধারণ করা প্রয়োজন। আহমদ মুহাররম সেই প্রয়োজন অনুভব করে তাঁর কাব্য রচনায় আত্মনিয়োগ করেন।

কাব্যটি প্রায় তিন হাজারেরও বেশি cO&w³‡Z বিস্তৃত। এতে ইসলামি ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কবির ভাষা নব্য-ধ্রুপদী, গম্ভীর, অলংকারসমৃদ্ধ এবং আবেগময়। তিনি আরবি কাসিদার ঐতিহ্যকে আধুনিক মহাকাব্যিক বিষয়বস্তুর সঙ্গে সমন্বিত করেছেন। ফলে রচনাটিতে একদিকে যেমন প্রাচীন আরবি কবিতার ভাষাগত সৌন্দর্য রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি আধুনিক ঐতিহাসিক চেতনা ও জাতীয়তাবাদী আবেগও প্রতিফলিত হয়েছে। আহমদ মুহাররম তাঁর জীবদ্দশায় কাব্যটির পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ দেখতে পারেননি। এর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং কবির মৃত্যুর পর আনুমানিক ১৯৬৩ সালের দিকে এটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর এটি আরবি সাহিত্যসমাজে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে।

তবে কিছু সমালোচক ‘দিওয়ান মাজদিল ইসলাম’ কে পূর্ণাঙ্গ মহাকাব্য হিসেবে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, এতে পাশ্চাত্য মহাকাব্যের মতো একক ছন্দ, অভিন্ন অন্ত্যমিল, সুসংহত নাটকীয় কাঠামো এবং ব্যাপক অতিলৌকিক উপাদান সর্বত্র অনুসৃত হয়নি। আবার অনেকে মনে করেন, মহাকাব্যের মূল্যায়নে কেবল ছন্দ বা কাঠামো নয়, বিষয়বস্তুর ব্যাপকতা, ঐতিহাসিক গুরুত্ব, জাতীয় চেতনা এবং বীরত্বের মহিমান্বিত উপস্থাপনাও বিবেচনা করা উচিত।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ‘দিওয়ান মাজদিল ইসলাম ’ আধুনিক আরবি সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাকাব্যিক প্রয়াস। এটি ইসলামি ইতিহাসকে কাব্যিক সৌন্দর্য, আবেগ ও বীরত্বের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করেছে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করেছে যে, আরবি কবিতা কেবল গীতিকবিতা বা সংক্ষিপ্ত কাসিদার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৃহৎ ঐতিহাসিক ও আদর্শিক বিষয়কে ধারণ করার সক্ষমতাও এর রয়েছে।

উপসংহার

মহাকাব্য মানবসভ্যতার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এটি কেবল দীর্ঘ আখ্যানমূলক কবিতা নয়, বরং কোনো জাতির ইতিহাস, বীরত্ব, ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক পরিচয়, নৈতিক আদর্শ এবং সম্মিলিত স্মৃতির শিল্পিত প্রকাশ। সুমেরীয় ‘গিলগামেশ ’ থেকে হোমারের ‘ইলিয়াড’, ভার্জিলের ‘ইনিড’, ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’, ভারত বর্ষের ‘রামায়ণ’  ও ‘মহাভারত’- সব মহাকাব্যই নিজ নিজ জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে। আরবি সাহিত্যে প্রাচীন যুগে শাস্ত্রীয় মহাকাব্যের বিকাশ সীমিত হলেও এর মহাকাব্যিক উপাদান ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ইসলামি ইতিহাস, নবীজীবন, মুসলিম বিজয় এবং বীরত্বগাথা আধুনিক যুগে মহাকাব্য রচনার জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে। এই ধারায় আহমদ মুহাররমের ‘দিওয়ান মাজদিল ইসলাম ’ একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ সৃষ্টি। এটি ইসলামি ইতিহাসকে মহাকাব্যিক মহিমায় উপস্থাপন করে আরবি সাহিত্যে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

অতএব বলা যায়, ‘দিওয়ান মাজদিল ’ইসলাম  কেবল একটি ঐতিহাসিক কাব্য নয়; বরং এটি ইসলামি চেতনা, জাতীয় গৌরব, ধর্মীয় আদর্শ, বীরত্ব ও নৈতিক সংগ্রামের এক মহিমান্বিত সাহিত্যিক দলিল। আধুনিক আরবি মহাকাব্যধারার বিকাশে এর অবদান নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যৎ গবেষণায় এ গ্রন্থের ভাষা, কাঠামো, ঐতিহাসিকতা, চরিত্রায়ণ ও মহাকাব্যিক বৈশিষ্ট্য আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

 তথ্যসুত্র :

1. উইকিপিডিয়া – Arabic Epic Literature : https://en.wikipedia.org/wiki/Arabic_epic_literature, Accessed on 21.12.2021 

2. World History or Encyclopedia (online 25/1/22) 

3. সম্পাদনা পরিষদ কর্তৃক সম্পাদিত, ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৪ খ্রি. পৃ. ১৩১ 

4. ড. মোঃ সাইফুল ইসলাম গনি , আরবি সাহিত্য কোষ। আল ফুনুন প্রকাশনী – ২০১৬ খ্রি. পৃ. – ২৭

5. Etymology Online Dictionary by Harper Collins- 2010. Accessed on  20-12-2021 

6. ড. মুহাম্মদ মানযুর, আল আদাব ওয়া ফুনুনুহু (মিশর দারুন নাহদাত), বৈরুতঃ দারুল যিল, ১৯৭১ খৃ, পৃ.৪৪

7. আহমদ কাব্বিশ, তারিখু আশ-শির আল-আরাবি আল-হাদিস, বৈরুতঃ দারুল যিল, 

8. ড. মুহাম্মদ মানযুর, আল আদাব ওয়া ফুনুনুহু, পৃ.৩৭২ 

9. Cambridge English Dictionary, Cambridge University press.

10. Oxford Dictionary, Oxford University press. Accessed on 14-11-2021 

11. Merrian webstes, Dictionary, E Dictionary.

12. ড. আহমাদ আমিন, আন নাকদুল আদাবি, প্রা দারুল মারেফা- বৈরুত, পৃ-৮০। 

13. শ্রীশ চন্দ্র দাশ, সাহিত্য সন্দর্শন, পৃ. ৬১

14. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮১, ড.  মোহাম্মাদ সাইফুল গণি ( নোমান), আরবি সাহিত্য কোষ । 

15. ড. মুহাম্মদ গুনাইমি হেলাল, আল আদাবুল মুকরিন (মিসর, দারুন নাহদাতি), পৃ. ১৪৪

16. The Amarican Heritage Dictionary, by Houghton Mifflin. 

17. Wikipedia, Internet, free encyclopedia

18. Muhammad Rafiq: Definition and Etymology of Epic” Article date 08-10-2016.

19. Webster’s new world dictionary

20. Encyclopedia of Britaniea. E. Encyclopedia

21. Jeremy M Downes, Dept of English, Auburn University. June 2015

22. History and origin of the epics: Types of the Epic subgenre (Online Version))

23. www.sparknotes,com/lit/theme/the Epic of Gilgamesh 

24. কবি হোমার: গ্রিক কবি (Homer বা Homaro’s) ৯ম শতাব্দীতে এশিয়ার মাইনরে জন্মগ্রহণ করেন। তার সম্পর্কে বিস্তারিত কোন তথ্য জানা যায়নি। তবে, ধারণা করা হয় যে তিনি অন্ধ ছিলেন। গ্রিক লেখকবৃন্দ তার তিনটি গ্রন্থ যথাক্রমে আল-আওনিসা, আল-ইলিয়াদ, আল-হাওয়ামিরিয়া তিনটি কাব্যগ্রন্থ বলে মনে করেন। পরবর্তী গ্রিক কাব্য সাহিত্যে বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছে। স্মার্ণা, রোডোস, কলোফোন, স্যালামিস, কিয়স, আর্গস ও এথনী- এই সাতটি শহরকে তার জন্মভূমি হিসাবে দাবী করা হয়। (মোঃ আবু বকর সিদ্দীক, আরবি সাহিত্য সমালোচনা, (ঢাকাঃ সুলতানা প্রকাশনী, ১৯৮৯খৃ./১৪১০হি.), পৃ.৩৮)

25. ইলিয়াড: ইলযারাহ শব্দটি ইলিয়াড এর আরবি শব্দ। আরবি ভাষায় ইলইয়াযাহ বা আলইয়াযাহ উভয়টিই ব্যবহৃত হয়। গ্রিক কবি হোমার (Homer ev Homeros) (৯ম শতাব্দী) গ্রিক বীর-কেশরীদের বীরোচিত দুঃসাহসিক ঘটনাবলি অবলম্বনে ‘ইলিয়াড’ নামক একটি মহাকাব্য (Epic) রচনা করেন। এখানে অভিন্ন ছন্দে ২৪টি কবিতায় ১৬ হাজার চরণ আছে। এ মহাকাব্যটি বর্ণনামূলক এবং সমুন্নত বাচনভঙ্গিতে রচিত। এর বিষয়বস্তু হল বীরত্বপূর্ণ উপকথা, জাতীয় বা ঐতিহাসিক অভিযান। (মোঃ আবু বকর সিদ্দীক, আরবি সাহিত্য সমালোচনা, (ঢাকাঃ সুলতানা প্রকাশনী, ১৯৮৯খৃ./১৪১০হি.), পৃ.৩৭-৩৮)     

26. The Odyssey is one two major ancient epic poems attributed to Homer written in 8th century BC. by Homeric Greek language with 12109 lines regarding Greek Hero Odysseus; king of Ithaca and his journey to home after the Trojan war. (https://en.wikipedia.org/wiki/Odyssey)

লেখক পরিচিতি: কর্নেল আবদুল মোক্তাদের, এমফিল, পিএইচডি