সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
পাঁচ স্থানে শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধে তীব্র যানজট, ভোগান্তিতে নগরবাসী
রাজধানীতে প্রতিদিন নতুন করে আসছেন কর্মমুখী কয়েক হাজার মানুষ। দিন দিন চাপ বাড়ছে এই মেগাসিটির উপর। তবে সেই তুলনায় বাড়ছে না রাস্তাঘাট। এর ফলেই যানজট যেন নিত্যসঙ্গী। কিন্তু ধারাবাহিক যানজটের এই শহরে যাত্রাবাড়ি-গুলিস্তান, খিলগাঁও, মতিঝিল, জাতীয় প্রেসক্লাব, শাহবাগ ও সাইন্সল্যাব, কাওরানবাজার,মিরপুর,বাড্ডাসহ রীতিমতো স্থবির হয়ে পড়েছে নগরজীবন। রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে তৈরি হয় তীব্র যানজট। মূলত সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনসহ নগরের পাঁচ স্থানে সড়ক অবরোধে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীরা।
বুধবার (১৪ জানুয়ারী) দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে সাইন্সল্যাব মোড় অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে আশেপাশে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এদিন দুপুর থেকে এই অবরোধে ঢাকা শহরে তীব্র যানজটে ভোগান্তিতে পড়েন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীরা।
আরও পড়ুন: অবৈধ গ্যাস সংযোগের তথ্য সংগ্রহকালে উত্তরায় সাংবাদিকের ওপর হামলা
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তর আন্দোলনের ডাকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব, টেকনিক্যাল ও তাঁতীবাজার মোড় অবরোধ করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এদিন বেলা ১টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন। গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে টেকনিক্যাল মোড় অবরোধ করা হয়। অন্যদিকে তাঁতীবাজার মোড় অবরোধ করা হয় দুপুর পৌনে ১২টা নাগাদ। অবরোধকারী শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবির পক্ষে নানা স্লোগান দিচ্ছেন। এসব স্লোগানের মধ্যে রয়েছে, রাষ্ট্র তোমার সময় শেষ, জারি করো অধ্যাদেশ। অবরোধের কারণে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোয় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী-চালকেরা। তবে দিনভর সাইন্সল্যাব মোড়ে যানবাহনের দীর্ঘ সারি রয়েছে। পথচারীরা গাড়িতে থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে নিজ গন্তব্যে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ গাড়িতে বসে রয়েছেন যানজট ছাড়ার অপেক্ষায়। ঠিকানা পরিবহনের যাত্রী শাহজালাল আহমেদ বলেন, অনেক যানজটে বসেছিলাম। বাধ্য হয়ে গাড়ি থেকে নেমে গিয়েছি। এমন যানজট যাত্রীদের জন্য খুবই ভোগান্তিকর। কিছু হলেই পথ আটকানো এটা এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এভাবে চলতে পারে না। আরেক পথচারী শরিফ হাসান বলেন, সব দিক দিয়ে রাস্তা ব্লক করা। কোনো গাড়ি চলতে পারছে না। অনেকেই জরুরি যাতাযাত করছেন। তাদের বেশি অসুবিধা হচ্ছে। যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে এক কিলোমিটার দূরের দক্ষিণ কুতুবখালী এলাকার ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাত্রাবাড়ীর দিকে আসছিলেন ভৈরব থেকে আসা তসলিম উদ্দিন। তাঁর মাথায় ২০ কেজির চালের বস্তা। আর পিঠে আরেকটি ব্যাগ। সঙ্গে হাঁটছেন স্ত্রীও। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এক ঘণ্টা গাড়িতে বসে বিরক্ত হয়ে নেমে গেছেন। রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে, এটা শুনে হেঁটেই যাত্রা করেছেন। যাবেন খিলগাঁও। একইভাবে রাজধানীর শাহবাগে প্রায় ১ঘন্টা গাড়িতে বসে থেকে হেঁটেই চলেছেন ফরহাদ নামে একজন যাত্রী। শুধু ফরহাদ কিংবা তসলিম উদ্দিনই নয়, শিক্ষার্থীদেও আন্দোলনে স্ববির রাজধানীতে বেশিরভাগ কর্মজীবি কিংবা গ্রাম-গঞ্জ থেকে নগওে আসা মানুষজন যানজটে হেঁটেই বাড়ি ফিরছেন।
আরও পড়ুন: মুসাব্বির হত্যা: তিন আসামি রিমান্ডে, একজনের স্বীকারোক্তি
তবে লালবাগ জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. আমিনুল কবীর তরফদার জানান, কবি কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা বেলা সাড়ে ১১টা থেকে পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার চৌরাস্তা অবরোধ করেন। এতে কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এদিন দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে বাংলা কলেজের শিক্ষার্থীরা টেকনিক্যাল মোড় অবরোধ করেন। এ সময় তারা ‘সেন্ট্রাল সেন্ট্রাল’,‘গোলামী না আজাদী’, ‘আপস না সংগ্রাম’, ‘তালবাহানা বন্ধ কর, অধ্যাদেশ জারি করো’ এমন বিভিন্ন স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা।
দারুসসালাম জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার ইমদাদ হোসেন বিপুল জানান, অবরোধের ফলে গাবতলী, মিরপুর ও টেকনিক্যাল মোড় এলাকায় ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হয়। এদিন দুপুর ১টার দিকে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধ করেন। এতে নিউ মার্কেট, ধানমন্ডি ও শাহবাগমুখী সব ধরনের যানবাহন আটকে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এদিকে সহপাঠী সাকিব হত্যার বিচার ও আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা প্রথমে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং পরে রাজধানীর ব্যস্ততম ফার্মগেট মোড় অবরোধ করেন। এতে ফার্মগেট ও খামারবাড়ি এলাকায় যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তবে শিক্ষার্থীরা জানান, হত্যাকাণ্ডের এক মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। অবরোধ চলাকালে ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’সহ নানা স্লোগান দেওয়া হয়। সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা মহাখালী মোড় অবরোধ করলেও তা প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে পুলিশের সহায়তায় তুলে নেওয়া হয়। পরে ওই এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনা বিভাগ জানায়, নগরীতে মোট আয়তনের ২৫ ভাগ রাস্তা থাকা প্রয়োজন। সেখানে ঢাকায় আছে মাত্র সাত থেকে আট ভাগ। এই সাত-আট ভাগেও পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। রাস্তার ওপর বাজার, অবৈধ পার্কিংয়ে রাস্তার শতভাগ ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে পরিবহন জট। রাজধানীতে ধারণক্ষমতার থেকে বেশি মানুষ বাস করে। অবকাঠামোর তুলনায় অতিরিক্ত গাড়ি। এমনিতে রাস্তার আয়তন কম, তার ওপর অবৈধ পার্কিং। এসব কারণে দিন দিন যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। তার উপর নানা ইস্যুতে শিক্ষত-শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তো আছেই।
শিক্ষার্থীদের ঘোষণা আনুযায়ী, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বুধবার থেকে রাজধানীর সাইন্সল্যাব মোড়ের পাশাপাশি টেকনিক্যাল ও তাঁতীবাজার মোড়ে অবরোধ কর্মসূচি থাকবে। এর আগে গত মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচি পালনের কথা জানানো হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভাতেই ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি আইন- ২০২৫’ এর অনুমোদন দিতে হবে এবং পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে চূড়ান্ত অধ্যাদেশ জারি করতে হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার আনিছুর রহমান বলেন, তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। আশা করছি অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
উল্লেখ্য, রাজধানীর সাতটি কলেজ নিয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বা ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের ঘোষণা দেওয়া হলেও চূড়ান্ত অধ্যাদেশ জারিতে বিলম্ব করায় শিক্ষার্থীরা অধ্যাদেশ জারির ১ দফা দাবি আদায়ে গত ১৩ জানুয়ারি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সাতটি কলেজ হলো- ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, সরকারি বাংলা কলেজ, কবি নজরুল কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজ।





