রাজধানীতে ফুটপাত উচ্ছেদ, পথচারিদের স্বস্তি,হকারদের হাহাকার
- জীবিকা হারিয়ে দিশেহারা হকারদের হাজারো পরিবার
- ডিএসসিসি এলাকায় ফুটপাত উচ্ছেদে হকারদো বোবা কাঁন্না
- হকারদের জন্য শুক্র-শনিবার নির্দিষ্ট স্থানে হলিডে মার্কেটের ব্যবস্থা
- সাধারণ মানুষের হাঁটার জন্য ফুটপাত উন্মুক্ত রাখা উচিত
- মানবিক বিবেচনায় হকারদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা উচিত
রাজধানীতে পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের অধিকার নিশ্চিত এবং যানজট মুক্ত করার লক্ষ্যে নগরের ব্যস্ততম রাস্তা ও ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত করতে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে নগর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিনের প্রশাসক। তবে উচ্ছেদ অভিযানে পথচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসলে ও হকারদের পুনর্বাসন না হওয়ায় জীবিকা সংকটের তৈরি হয়েছে হাহাকার। তাদের পিঠে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার নিম্নবিত্ত মানুষের তীব্র হাহাকার ও কান্নার গল্প। ফুটপাত থেকে আকস্মিকভাবে উচ্ছেদ হওয়ার কারণে রাতারাতি জীবিকা হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন ক্ষুদ্র হকাররা। এককথায় বলতে গেলে ফুটপাত উচ্ছেদে তাই একদিকে স্বস্তি ফিরছে পথচারীদের মধ্যে, অন্যদিকে জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় নীরব কান্নায় দিন কাটছে হকারদের।
সরেজমিনে রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অন্য দিনগুলোতে যেসব ফুটপাতে তিল ধারণের জায়গা থাকত না, সেখানে এখন সুনসান নীরবতা। কোথাও কোথাও ভাঙা চৌকি, প্লাস্টিকের বস্তা আর কিছু পরিত্যক্ত মালামাল পড়ে আছে—যা উচ্ছেদ অভিযানের সাক্ষী বহন করছে। উচ্ছেদের শিকার হকারদের চোখে-মুখে এখন শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফুটপাতে জুতো বিক্রি করে সংসার চালাতেন মো. রহমত আলী। ক্ষোভ আর কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, আমাদের না আছে কোনো পুঁজি, না আছে বড় দোকান দেওয়ার সামর্থ্য। প্রতিদিন যা বিক্রি করতাম, তা দিয়ে রাতে চাল-ডাল কিনে বাড়ি ফিরতাম। হুট করে দোকানটা ভেঙে দেওয়ায় এখন পরিবারের মুখে কী অন্ন তুলে দেব, তা ভেবে পাচ্ছি না। আমাদের পুনর্বাসন না করে এভাবে তাড়িয়ে দেওয়া মানে আমাদের মেরে ফেলা। একই চিত্র দেখা যায় নারী হকার সুমি বেগমের ক্ষেত্রেও। স্বামীর মৃত্যুর পর ফুটপাতে পিঠা ও চা বিক্রি করেই তার দুই সন্তানের পড়াশোনা আর ঘরভাড়া চলত। তিনি বলেন, আমরা তো চুরি-ডাকাতি করি না, কষ্ট করে খাই। ফুটপাত অবৈধ জানি, কিন্তু আমাদের বাঁচার তো অন্য কোনো উপায় নেই। উচ্ছেদের পর গত তিন দিন ধরে বাচ্চাদের ঠিকমতো খাওয়াতে পারছি না।
আরও পড়ুন: পূর্বাচল ৩০০ ফিটে রাজউকের অনুমোদনহীন ১৫ বিলবোর্ড উচ্ছেদ
এদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) সাম্প্রতিক কঠোর উচ্ছেদ অভিযানের কারণে চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন রাজধানীর সাধারণ হকাররা। জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাটসহ প্রধান সড়ক এবং ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত করতে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবদুস সালাম কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে অভিযান পরিচালনা করেছেন। তবে ডিএসসিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, অনুমোদিত সীমানার বাইরে সড়ক বা ফুটপাতে দোকান বসালে সরাসরি মালামাল ক্রোক ও অন-স্পট মামলা দায়ের করা হবে। পুনর্বাসন বা উচ্ছেদের আগে নতুন কোনো নোটিশ দেওয়া হবে না, কারণ এর আগেই হকার নেতাদের সাথে এ বিষয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। একইসঙ্গে ঢাকার সব হকারকে সিটি কর্পোরেশনের একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় এসে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন নিতে হবে। নিবন্ধন ছাড়া কাউকেই ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। সেগুনবাগিচা বা শিল্পকলা একাডেমির মতো সংলগ্ন এলাকাগুলো হকারমুক্ত করে সাধারণ পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। তবে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু স্থান এবং শুক্র-শনিবারের হলিডে মার্কেট বা বিকল্প জায়গায় বসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তারপরও দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতে ছোট পরিসরে ব্যবসা করে সংসার চালিয়ে আসা হকাররা পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা ও বাসাভাড়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। হঠাৎ উচ্ছেদ অভিযানে দোকানপাট সরিয়ে নেওয়ায় অনেকেই পড়েছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। হকাররা বলছেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করা প্রয়োজন। তবে তাদের পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করা হলে পরিবার নিয়ে চরম সংকটে পড়তে হবে। অনেকের দাবি, সিটি করপোরেশন চাইলে নির্দিষ্ট জায়গায় তাদের ব্যবসার সুযোগ করে দিতে পারে। এক হকার বলেন, ফুটপাতে বসে ব্যবসা করা আমাদের শখ নয়। পরিবার চালানোর জন্য বাধ্য হয়ে এখানে বসেছি। উচ্ছেদ হলে কোথায় যাব, কীভাবে সংসার চালাব—সেটাই এখন বড় চিন্তা। অপরদিকে রাজধানীর মিরপুর-১০ ও আশপাশের এলাকার ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের পর যাতায়াতে স্বস্তি ফিরেছে। পথচারীরা নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারছেন। বিভিন্ন শপিংমলের ব্যবসায়ীরাও এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের পুনর্বাসনের দাবিও জানিয়েছেন অনেকে। এরআগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ নম্বরের হোপ মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করা হয়। এ সময় সিটি করপোরেশনের তিনটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক যেকোনো মূল্যে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার ঘোষণা দেন। উচ্ছেদের ৬ দিন পর মঙ্গলবারর হোপ মার্কেট এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা মো. নুরুল আফসার বলেন, ফুটপাত দখলের কারণে পথচারী ও ক্রেতাদের ভোগান্তিতে পড়তে হতো। বিশেষ করে বিকেলে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। তিনি বলেন, বর্তমানে ফুটপাত পরিষ্কার। পরিবেশও সুন্দর লাগছে। তবে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গার ব্যবস্থা করা উচিত। মিরপুর-১০ নম্বর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনের ‘ক্যাফে কর্নার’-এর বিক্রয়কর্মী মো. রমজান আলী বলেন, উচ্ছেদের পর দোকানে বেচাকেনা কিছুটা বেড়েছে। আগে দোকানের সামনের শাটারও ঠিকমতো খুলতে পারতাম না। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের হাঁটার জন্য ফুটপাত উন্মুক্ত রাখা উচিত। তবে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তবে সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থী মাহমুদুর রহমান বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় বেকার হয়ে পড়া হকারদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা বা পুনর্বাসন করা উচিত। তবে মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার বলেন, মিরপুর-১০ ও ১৩ নম্বর এলাকার দীর্ঘদিনের ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়েছে। এখন ফুটপাত পরিষ্কার রাখা এবং আগের অবস্থায় ফিরে না যাওয়ার বিষয়টি তদারক করা হচ্ছে। তিনি বলেন, যেকোনো মূল্যে ফুটপাত পরিষ্কার রাখা হবে। উচ্ছেদের দিন থেকেই পুলিশ মাঠে ছিল, এখনো আছে এবং পরবর্তী দিনগুলোতেও থাকবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কর্মসংস্থান হারানো এই বিশাল জনগোষ্ঠী জীবিকার তাগিদে চরম পথ বেছে নিতে পাওে, যা অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করে। তাদের মতে, ফুটপাত দখলমুক্ত করা অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং যানজট নিরসনে এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে কোনো ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা বা পুনর্বাসন ছাড়া হুট করে এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে উচ্ছেদ করা হলে তা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করে। কর্মসংস্থান হারানো এই বিশাল জনগোষ্ঠী জীবিকার তাগিদে চরম পথ বেছে নিতে পারে, যা অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকার্স সংগঠনগুলোর দাবি, তারা উচ্ছেদ অভিযানের বিরোধী নন, তবে তা হতে হবে সুশৃঙ্খল এবং মানবিক। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট ‘হলিডে মার্কেট’ বা সময়ভিত্তিক বিক্রয় অঞ্চল (টাইম জোন) নির্ধারণ করে দেওয়ার দাবি জানান তারা। যেখানে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে বা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তারা নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে পারবেন। উচ্ছেদ অভিযান শহরকে সুন্দর ও গতিশীল করার জন্য জরুরি হলেও, হাজারো মানুষের পেটে লাথি মেরে সেই সৌন্দর্য কতটুকু টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। মানবিক দিক বিবেচনা করে এবং হকারদের পুনর্বাসনের জন্য একটি স্থায়ী ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, জীবিকা হারানোর এই হাহাকার কেবল ফুটপাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা পুরো সমাজের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই আঘাত করবে।
আরও পড়ুন: রাড্ডায় ভাঙচুর-লুটপাটের ঘটনায় সাইবার দলের নেতা গ্রেপ্তার





