ভর্তির শর্তেই বই কেনা: গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬ বছরের চর্চা

Sanchoy Biswas
মবিনুল ইসলাম রাশা, গণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:৫৩ অপরাহ্ন, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১:২১ অপরাহ্ন, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে (গবি) ভর্তি শুরু হয় শর্ত দিয়ে। ভর্তি সম্পন্ন করতে নতুন শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট প্রকাশনার বই কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে, যার জন্য নেওয়া হচ্ছে এককালীন ২,০০০ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ২৬ বছর ধরে এই প্রথা চলছে।

জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক বিভাগে চলমান জানুয়ারি–জুলাই সেশনের ভর্তি কার্যক্রমেও একই নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে। ভর্তি ফরম পূরণ ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে হলে নির্দিষ্ট কিছু বই নিতে হচ্ছে বাধ্যতামূলকভাবে। এসব বই না নিলে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাচ্ছে না।

আরও পড়ুন: এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জরুরি নির্দেশনা মাউশির

একাধিক সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছর পরিবর্তন হলেও ভর্তির সময় নির্দিষ্ট প্রকাশনার বই কেনার এই নিয়মে কোনো পরিবর্তন আসেনি। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বইগুলো আগে থেকেই থাকলেও বা এসব বইয়ের বাস্তব প্রয়োজন না থাকলেও, টাকা পরিশোধ ছাড়া বিকল্প দেওয়া হয় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নতুন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ভর্তি হওয়ার সময় বইয়ের নামে তার কাছ থেকে ২,০০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। বই না নিলে ভর্তি সম্পন্ন করা যাবে না বলে জানানো হয়। তিনি বলেন, এসব বই সাধারণ পাঠ্যবই নয় এবং বাজারেও সহজলভ্য নয়।

আরও পড়ুন: জবিতে সরস্বতী পূজায় এবারও নারী পুরোহিত

তিনি আরও অভিযোগ করেন, “মুসলিম শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও আমাকে হিন্দু ধর্মভিত্তিক একটি বই দেওয়া হয়েছে, যেখানে দুর্গাপূজা, মহাপ্রভু চৈতন্যসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার ও উৎসবের আলোচনা রয়েছে। নির্দিষ্ট একটি ধর্মের বই জোর করে দেওয়া আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে। সব ধর্ম নিয়ে সাধারণ জ্ঞানমূলক বই হলে আপত্তি থাকত না।”

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই বিভাগের শিক্ষার্থী লোকমান হাকিম বলেন, অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এসব বই আগে থেকেই আছে বা এগুলোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু বই না নিলে ভর্তি সম্পন্ন হবে না এবং টাকা ফেরতও দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, টাকা সঙ্গে না থাকলে ধার করতে বা বিকাশের মাধ্যমে বাড়ি থেকে আনতে বলা হয়েছে।

ভর্তি কার্যক্রম ঘুরে দেখা গেছে, বাধ্যতামূলকভাবে দেওয়া এসব বইয়ের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা গণমুদ্রণ থেকে প্রকাশিত। ভর্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের হাতে গুচ্ছ আকারে বই তুলে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ সত্ত্বেও এই বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

গণমুদ্রণের নিয়োজিত কর্মকর্তা মো. আফফাত হোসেন বলেন, তিনি কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করছেন। তাঁর দাবি, বইয়ের জন্য নেওয়া অর্থ ভর্তি ফি-র মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত এবং আলাদাভাবে কোনো টাকা আদায় করা হয় না। এই অর্থ সরাসরি গণমুদ্রণ প্রকাশনায় জমা হয়।

বিষয়টি নিয়ে গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সমাজকল্যাণ ও ক্যান্টিন সম্পাদক মনোয়ার হোসেন অন্তর বলেন, “গণমুদ্রণের বই বিক্রি না হলে তার দায় কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো যায় না। ভর্তি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জোরপূর্বক বই চাপিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক ও অনৈতিক। গণমুদ্রণ টিকে থাকবে কি না, সেটার দায় শিক্ষার্থী বা তাদের পরিবারের নয়। শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এমন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ন্যায্য আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।”

অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন বলেন, “ভর্তির সময় শিক্ষার্থীরা এই শর্ত মেনে ভর্তি হয় যে তাদের গণমুদ্রণের বই কিনতে হবে।” তিনি জানান, বিষয়টি আগে বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টির সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। উপাচার্যের দাবি, গণমুদ্রণের বই বিক্রির লাভ কোনো ব্যক্তির কাছে যায় না; তা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়। শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরও নির্দিষ্ট পরিমাণ বই কিনতে হয়।