গরুর মাংসের খিচুড়ি থেকে গরুভোজের ঘোষণা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কী ঘটছে?

Sanchoy Biswas
বিবিসি বাংলা
প্রকাশিত: ৯:২৪ অপরাহ্ন, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৯:২৪ অপরাহ্ন, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মন্দিরের কাছে গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্নার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সেই বিতর্কের জেরে ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের একাংশ বিক্ষোভ করে এবং আবার গরুভোজ কর্মসূচি ঘোষণা করে।

আরও পড়ুন: পদত্যাগ করেছেন ইবি ডিবেটিং সোসাইটির বিতর্কিত সভাপতি

এরই মধ্যে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে আরও একটি বিজ্ঞপ্তি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এরপর শিক্ষার্থীদের একাংশ জানিয়েছে, শুক্রবার তারা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক গরু জবাই করবে।

আরও পড়ুন: গণমাধ্যম ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সংযোগ জোরদারে ঢাবি-ঢাকা ডক্ল্যাবের সমঝোতা

ঘটনার শুরু গত ১২ই অক্টোবর। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ১৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চের কাছে গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেন।

তবে আয়োজনস্থলের পাশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির থাকায় কয়েকজন হিন্দু শিক্ষার্থী আপত্তি জানান। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে কিছু কথা কাটাকাটিও হয় বলে দাবি হিন্দু শিক্ষার্থীদের। তারা এও বলছেন যে, ১৭তম ব্যাচের ওই শিক্ষার্থীরা 'ইচ্ছাকৃতভাবে মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না' করেছে।

যদিও আয়োজক শিক্ষার্থীরা বলছেন, কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়াটা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না এবং হিন্দু শিক্ষার্থীদের আপত্তির পর তারা মন্দির থেকে কয়েক হাত দূরে গিয়েই রান্না করেছেন।

যদিও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব জয় সাহা নিজেও মন্দির থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে রান্না করার বিষয়টি বিবিসি বাংলার কাছে স্বীকার করেছেন।

ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে

১২ই অক্টোবর রাত ৮টার দিকে মন্দিরের সামনে কয়েকজনকে খিচুড়ি রান্না করতে দেখে জয় সাহাসহ আরও কয়েকজন গিয়ে ওই শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে জানতে চান, "এটা কিসের খিচুড়ি?"

শুরুতে ওই শিক্ষার্থীরা এই প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছিলো বলে দাবি করেন জয় সাহা। তিনি বলেন, "মাংস দেখে মনে হলো এটা মুরগি না; হয় খাসি বা গরু। পরে একজন বললো, গরু। যেহেতু মন্দিরের সামনে, আমাদের একটু হলেও খারাপ লাগছে। আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগছে। আমরা তাদের সরায়ে নিতে বলি।"

"তাদের কেউ কেউ বললো, আপনারা মন্দিরের সীমানা নির্ধারণ করে দেন। ওরা উত্তেজিত হওয়ার মতো কথা বলছিল, একপ্রকার ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছিলো আমাদেরকে। আমরাও আট-দশজন ছিলাম, উত্তেজিত হলাম। এর মাঝে প্রক্টর স্যার আসেন এবং পরে ওরা প্রায় দশ হাত দূরে যায়," বলছিলেন মি. সাহা।

সেদিন দু'পক্ষের কথা কাটাকাটির প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে ক্যাম্পাসে একটি মিছিল করেন সনাতন শিক্ষার্থীরা ।

এরপর এ নিয়ে সামাজিক সোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্ক শুরু হয়।

ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি রাকিব মাদবর এ প্রসঙ্গে বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে উভয় ধর্মের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গ্রুপে তর্ক-বিতর্ক করে এবং এক পর্যায়ে এটি গণমাধ্যমের নজরে আসে; শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ও বিজ্ঞপ্তি দেয়।

"তখন মুসলিম কমিউনিটির একটু উগ্রপন্থীরা ইচ্ছাকৃতভাবে বলে যে যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে এটা বাধা দেওয়া হইছে, যেহেতু বাংলাদেশে ৯২ শতাংশ মুসলিম, তাই এর প্রতিবাদে আবারও আমরা আয়োজন করবো। শিক্ষার্থীদের একটা গ্রুপ এটা প্রচার করে," যোগ করেন রাকিব মাদবর।

তবে শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বলছেন, এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিলো মন্দিরের ইট ব্যবহারকে কেন্দ্র করে।

কারণ মন্দিরের সামনে কিছু অব্যবহৃত ইট পড়ে ছিল এবং ১৭তম ব্যাচের ওই শিক্ষার্থীরা সেগুলো নিয়ে চুলা বানিয়ে রান্নার আয়োজন করতে শুরু করে। তখন হিন্দু শিক্ষার্থীরা বাধা দেয় যে ইটগুলো মন্দিরের।

যদিও জয় সাহা বলছেন, "মেইন আপত্তিছিল মন্দির এত সামনে। ওরা ন্যারেটিভ নিয়ে গেছে ইটের দিকে।"

তবে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের অনেকে বলছেন, তারা যে ইটগুলো নিয়েছিলো, সেগুলো তারা আর ব্যবহার করেনি, ফিরিয়ে দিয়েছে এবং পরে ক্যাফেটেরিয়া থেকে চুলা এনে রান্না করেছে।

প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি, তারপর ব্যাখ্যা

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গরু জবাই হতে পারে, আভাস পেয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে প্রশাসন।

গতকাল ১৪ই অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. আজম খানের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ক্যাম্পাসে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের পশু জবাই থেকে বিরত থাকতে হবে। নির্দেশনা অমান্য করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সেই গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, 'পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১' অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত জবাইখানা ছাড়া অন্য কোথাও পশু জবাই এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার সিল ছাড়া মাংস বিক্রি করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ছাড়া বাজারে বিক্রির জন্য রাখা মাংসের প্রতিটি খণ্ডে ডিএসসিসির অনুমোদনের সিল থাকা বাধ্যতামূলক।

নির্দেশনা অমান্য করলে আইনের ২৪ ধারা অনুযায়ী অনধিক এক বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ড হতে পারে।

পাশাপাশি অবৈধ মাংস বাজেয়াপ্ত ও সংশ্লিষ্ট দোকান সিলগালা করার কথাও বলা হয়েছে এতে।

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার ক্যাম্পাসে গরু ভোজের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত পোস্টে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। এতে অংশগ্রহণের জন্য ৭০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের এ কর্মসূচির বিষয়ে অধ্যাপক আজম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "যে ঘটনা ঘটছে তা খুব-ই তুচ্ছ ছিল। গতকাল আমরা বুঝতে পারলাম যে পশু কোরবানি হবে। তাই একটি নোটিশ জারি করি। কারণ পূজা-টূজা চলছে, এরকম করে যেন পশু জবাই না করা হয়। তাই নিষেধ করেছিলাম। এতে ছাত্রদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তারা বলছে যে শুক্রবার তারা গরু জবাই করবে।"

এরপর পরিস্থিতি সামলাতে আবারও নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ওইদিন-ই আরেকটি পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, গত ১২ই অক্টোবর রাতে খিচুড়ি রান্নাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ভুল বোঝাবুঝি প্রক্টরের উদ্যোগে ঘটনাস্থলেই সমাধান করা হয়। পরদিন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আলোচনার মাধ্যমেও বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়। তবে পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে পশু জবাইয়ের সম্ভাব্য কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে নতুন করে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হওয়া এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির অবনতি এড়াতে প্রক্টর এ ধরনের কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

এই আহ্বানকে কেন্দ্র করে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে প্রশাসন জানায়, ক্যাম্পাসে পশু জবাইসহ যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের অধিকার সবার রয়েছে। তবে একটি আয়োজন যেন অন্য কোনো আয়োজনের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় অনুমতি দিবে?

শুক্রবারের গরুভোজ কর্মসূচির আয়োজকরা জানিয়েছেন, গরু জবাই ওইদিন-ই হবে।

জানা গেছে, গরু কেনার জন্য যে চাঁদা উঠেছে, তা দিয়ে ইতোমধ্যে একটি গরু কেনাও হয়ে গেছে। এছাড়া, বাংলাদেশ ছাত্র মজলিশ নামের একটি সংগঠন শিক্ষার্থীদেরকে একটি গরু দিবে।

আয়োজক কমিটির একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, "গরু নিয়া যেহেতু এত ক্ষোভ, তাই আমরা ভাবছিলাম দূর্গাপূজার পর গরু নিয়া আয়োজন করবো। কিন্তু গতকাল যখন প্রশাসন বিজ্ঞপ্তি দিল যে ক্যাম্পাসে গরু জবাই দেওয়া যাবে না, তখন এটা শিক্ষার্থীদের আহত করে।"

"প্রশাসন এই কাজটা যেহেতু করলো, তাই শিক্ষার্থীরা ফান্ড তুললো। আগামীকাল পার্টিটা হবে।"

তিনি জানান, তারা মন্দিরের সামনে না, হয়তোবা কলাভবনের কাছের মাঠে গরু জবাই করবেন।

এদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) আব্দুল আলিম আরিফ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "প্রশানের সাথে আজ জকসুর বৈঠক হয়েছে। উভয় পক্ষ থেকেই সম্মতি এসেছে যে আয়োজনটা করতে পারে। এটা প্রশাসনের প্রতিবাদস্বরূপ একটা আয়োজন।"

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আজম খান এ প্রসঙ্গে বলেন, এমনিতে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব কোরবানির সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের উন্মুক্ত স্থানে পশু কোরবানি করা হয়।

কিন্তু এখন প্রতিবাদস্বরূপ যদি শিক্ষার্থীরা শুক্রবার গরু জবাই করেও, তাহলে "মার্জিতভাবে করতে হবে" যাতে ধর্মীয় দিক থেকে নতুন করে কোনো ঘটনার সৃষ্টি না হয়, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

এদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব জয় সাহা গরু জবাই প্রসঙ্গে বলেন, "ওরা ক্যাম্পাসে গরু জবাই করতে চাইছে, করুক, সমস্যা নাই। কিন্তু সেটা যেন মন্দিরের সামনে না হয়, মন্দিরের শৃঙ্খলা নষ্ট না হয়। ওরা ১০টা গরু জবাই করুক, মন্দিরের সামনে না করুক।"