দেড় যুগ পর ব্যালট উৎসবে মেতেছে দেশ
দীর্ঘ আন্দোলন, প্রাণহানি আর জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তনের পর অবশেষে ফিরেছে ভোটের উৎসব। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আজ দেশের ২৯৯টি আসনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটার। দেড় দশকের বেশি সময় পর অনেকের কাছেই এটি শুধু নির্বাচন নয়, এটি ইতিহাসের স্বাক্ষী হওয়া। দীর্ঘ সময় পর এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসা কেবল একটি নির্বাচন নয়, বরং জনমতের প্রতিফলনের এক নতুন অধ্যায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিরতিহীনভাবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। ভোট শেষ হওয়ার পরই সংসদ নির্বাচন, পোস্টাল ব্যালট ও গণভোটের ব্যালট একসঙ্গে গণনা করা হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
আরও পড়ুন: ১২টা পর্যন্ত ৩২,৭৮৯ কেন্দ্রে ভোটের হার ৩২.৮৮ শতাংশ: ইসি সচিব
এই দীর্ঘ সময়ে একটি পুরো প্রজন্ম প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে, যারা আগে কখনো ব্যালটে সিল মারার অভিজ্ঞতা পায়নি। তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার এই ফিরে আসাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে।
দীর্ঘ বিরতির পর আজ ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনে সরাসরি অংশ করছেন। এ নির্বাচনে নতুন ভোটারদেরও অংশগ্রহণ বেড়েছে। যারা গত দুই দশকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, তাদের জন্যও এটি জীবনের প্রথম ব্যালট অভিজ্ঞতা।
আরও পড়ুন: গোপালগঞ্জের ভোটকেন্দ্রে নেই ভোটার
লালবাগের সিরাজউদ্দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দিয়েছেন দৃই ভাই ফাইয়াজ আহমেদ ও ফারহান আহমেদ। তারা বাংলাবাজার পত্রিকাতে বলেন, আমরা এক্সাইটেড, জীবনের প্রথম ভোট দিলাম। ভালো একটা অভিজ্ঞতা হলো, পরিবেশটা ভালো, আগামীতেও এই রকম পরিবেশ থাকুক, এমনটাই প্রত্যাশা করি।
প্রায় ৮০ বছর বয়সী জাহানারা আহমেদ তার সেজো ছেলেকে নিয়ে লালাবাগ শিশু হাসপাতাল ভোট কেদ্রে এসেছেন। ভিড় বাড়ার আগেই এসে পৌঁছেছিলেন– উদ্দেশ্য একটাই, ভোট দেবেন।
জাহানারা আহমেদের জন্য এটা শুধু নাগরিক দায়িত্ব ছিল না, ছিল ১৮ বছরের অপেক্ষার অবসান। তিনি বলেন, সর্বশেষ ভোট দিয়েছি ২০০৮ সালে। আজ নিজের হাতে ভোট দিতে পেরেছি, খুব ভালো লাগছে।
ঢাকা-০৭ আসনের কয়েকটি কেন্দ্রের মধ্যে এই দুইটি অন্যতম। এই নির্বাচনী এলাকায় সকাল থেকেই ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশের কথা জানান এখানকার দায়িত্বরত কর্মকর্তারা।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকেই স্কুলের সামনে দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন প্রায় ৫০০ ভোটার। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বাড়তে থাকে।
প্রথমবার ভোট, তরুণদের উচ্ছ্বাস
সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রের আশপাশে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। একাধিক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশই এবারের পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্ট। অনেক তরুণ জানান, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ তাদের আস্থা বাড়িয়েছে। তরুণ ভোটার শাহজাদা বলেন, ভোট দেওয়া আমাদের অধিকার, আবার দায়িত্বও। আগের মতো পরিবেশ থাকলে হয়ত অনেকেই আসত না।
২৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদ্দাম, ২০২২ সালে ভোটার হয়েছেন তিনি। সকাল ৮টা ৪৮ মিনিটে ব্যালট নিয়ে ৩ মিনিটের মধ্যেই ভোট দিয়ে বের হয়ে বলেন, এটাই আমার প্রথম ভোট। পরিবেশ খুব ভালো। এত বছর পর ঠিকভাবে ভোট দিতে পারলাম।
২৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ শামীম পারভেজও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। ২০২২ সালে ভোটার হলেও ২০২৪ সালে ভোট দিতে পারেননি। তিনি বলেন, আজ প্রথমবার ভোট দিতে পারলাম। ভালো লাগছে।
দুই বোন জিনাত আনফিন ও জেনিফা তাসনিম– এবারই প্রথম ভোট দেন। সকাল ৮টার মধ্যেই ভোট দিয়ে বের হয়ে আঙুলের কালি দেখিয়ে সেলফি তুলেছেন।
এসময় জিনাত বলেন, গতবার ভোটের পরিবেশ ছিল না, তাই আসিনি। এবার পরিবেশ ভালো লেগেছে, তাই ভোট দিলাম। পরিবর্তনের বার্তা যেন বাস্তব কাজেও দেখা যায়।
জেনিফা বলেন, এটাই আমার প্রথম ভোট। আমি খুবই এক্সাইটেড, সুন্দর পরিবেশে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছি।
মিরপুরের হযরত শাহ্ আলী মহিলা কলেজে ভোট দিতে আসা আরেক তরুণ ভোটার মোহাম্মদ জমির বলেন, আমরা তাদের ভোট দিলাম, আশা করি নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে তরুণদের কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব দেবেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভোটার প্রায় ৫ কোটি। জাতীয় যুবনীতি ২০১৭ অনুযায়ী, এই বয়সসীমার নাগরিকদের ‘যুব’ হিসেবে ধরা হয়।
নিজের হাতে একটি ব্যালট বাক্সে ফেলে আসার অভিজ্ঞতাই দিনটিকে স্মরণীয় করে তুলেছে ভোটারদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যালট পেপারে ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের একটি চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের দীর্ঘ সারি এবং স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে কতটা আগ্রহী। ভোট কেবল একটি নাগরিক দায়িত্ব নয়, এটি পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে এই নির্বাচনী আমেজ দেশের স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ১৮ বছরের এই ব্যবধান ঘুচিয়ে মানুষ এখন চায় একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ আগামী।





