উচ্চ সুদের আবর্তে চা উদ্যোক্তারা, বিক্রয়মুল্যে উৎপাদন ব্যয় উঠে না
দেশে উৎপাদিত বিপুল পরিমান চা এখন দেশেরই চাহিদা পূরণ করে। কিন্ত উৎপাদকরা নিলামে চা বিক্রি করে যে দর পান তাতে উৎপাদন খরচই উঠে না। এর উপর রয়েছে উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণ পরিশোধের তাগিদ। এ দুই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই টিকে থাকার চেষ্টা করছেন চা শিল্পের উদ্যোক্তারা।
আরও পড়ুন: ২৫ জুন পর্যন্ত তিতাস এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ
ঐতিহাসিকভাবে দেশে উৎপাদিত চা বিক্রি হয় নিলাম পদ্ধতিতে। চট্রগ্রামে বাংলাদেশ চা বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ও টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিটিএবি) আয়োজনে প্রতি সোমবার এই নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। বাগান থেকে চা এসে নির্দিষ্ট গুদামে জমা হয়। নিলামের আগে ব্রোকাররা চা টেস্টিং (মান যাচাই) করে ক্যাটালগ ও প্রাক্কলিত মূল্য তৈরি করেন। নিলামে বিডার বা ক্রেতারা অংশগ্রহণ করেন এবং তাৎক্ষণিক মূল্যে তা বিক্রি হয়।
সংশ্লিষ্ট সুত্রগুলো জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার প্রতি কেজি চা-এর সর্বনিম্ন মুল্য বেঁধে দেয়ায় উৎপাদকরা একটু বেশি দর পেতে শুরু করেছে। কিন্ত তারপরও বিক্রয়মুল্য উৎপাদন মুল্যের সমপর্যায়ে উন্নীত হয়নি। ২০২৩-২৪ মৌসুমে চায়ের গড় দর ছিল প্রতি কেজি ১৭১ টাকা ২৪ পয়সা। উৎপাদকদের দীর্ঘদিনের দাবীর প্রেক্ষিতে সরকার ’ফ্লোর প্রাইস’ তুলে দিয়ে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে কেজি প্রতি চায়ের দর ১০ টাকা থেকে ৮৫ টাকা পর্যন্ত বাড়ায়। এতে ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রতি কেজির মুল্য বেড়ে ২৪৫ টাকা ৫০ পয়সা পর্যস্ত পৌঁছায়। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, বাগান মালিকদের উৎপাদিত চায়ের অন্তত ৭৫ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করতে হয়। চট্রগ্রামের বাইরে সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) এবং পঞ্চগড়ে চা নিলাম কেন্দ্র চালু হয়েছে। তবুও বাজারজাতকরন সুবিধা ও ঐতিহাসিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে অবস্থিত নিলাম কেন্দ্রটি একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখছে।
আরও পড়ুন: ৩০ হাজার টন জ্বালানি তেল নিয়ে দেশে পৌঁছেছে আরও একটি জাহাজ
কাপনা টি কোম্পানি’র উদ্যোক্তা ও বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান কামরান টি রহমান দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, ”আমরা চা বিক্রি করে উৎপাদন মুল্যও পাই না। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। রয়েছে ঋণ পরিশোধের তাগিদ। কিন্ত আমাদের আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য নেই। এভাবেই টিকে থাকার চেষ্টা করছি আমরা।”
অভিযোগ করে কামরান টি রহমান বলেন, ”চা একটি কৃষি-ভিত্তিক শিল্প। এই শিল্পে ব্যাংকঋণের সুদ হওয়া উচিত কৃষিঋণের মতো। কিন্ত আমরা সেই সুযোগ পাই না। শিল্পঋণের মতোই আমাদেরকে সুদ গুনতে হয়। সরকার যদি এদিকে নজর না দেয় তাহলে এই উদ্যোক্তারা খুব বেশি দিন আর্থিক দায় বহন করতে পারবে না। তখন চা উৎপাদনে আগ্রহ হারাবে এবং ফলশ্রুতিতে দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে চা আমদানির উপর নির্ভরতা বাড়বে।”
তিনি জানান, বাংলাদেশে স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫৬ বছরে চা উৎপাদন প্রায় তিনগুণেরও বেশি হয়েছে। ১৯৭১ সালে চা উৎপাদন হতো ৩ কোটি ১০ লাখ কেজি। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১০ কোটি কেজি। চা উৎপাদন না বাড়লে দেশের চাহিদা পূরণে নিত্য প্রয়োজনীয় এই পণ্যটি আমদানি করতে হতো। সুতরাং দেখা যাচ্ছে উদ্যোক্তারা স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে বিপুল পরিমান বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে। এতে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ড সুত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে ১৭০টি নিবন্ধিত চা বাগান ও প্রায় ২ হাজার ৫০০ ক্ষুদ্র চা-চাষি রয়েছেন। মোট ২ লাখ ৯৪ হাজার ১৪২ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। এই শিল্পে এক লাখের বেশি মানুষ সরাসরি এবং আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন।
বিটিএ চেয়ারম্যান বলেন, চা শিল্প একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের আওতায় নিয়ে এসেছে।
একসময় রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনকারী এই চা শিল্পে বাংলাদেশ বিশ্বে বর্তমানে অষ্টম বৃহত্তম উৎপাদক। তিন দশক আগে এই অবস্থান ছিল পঞ্চম। বিশ্বের মোট চা উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে চীন, ভারত ও কেনিয়া থেকে। বৈশ্বিক উৎপাদনে বাংলাদেশের অংশ দেড় শতাংশের মতো। একসময় বিশ্বে শীর্ষ রপ্তানিকারকদের মধ্যে থাকলেও এখন দেশীয় চাহিদা বৃদ্ধির কারণে রপ্তানির সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিপরীতে প্রতি বছর প্রায় ২০-২৫ লাখ কেজি চা আমদানি হয়ে থাকে। বিটিএ’র পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সমপরিমান চা বাংলাদেশ প্রতি বছর রপ্তানিও করে।





