জে-১০ সিই এখন দুনিয়া জুড়ে আলোচনায়
আকাশ প্রতিরক্ষায় চীনের চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ক্রয়ের চুক্তি প্রস্তুত
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন মডেলের চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টি রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এমআরসিএ), ফাইটার এয়ারক্রাফট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার ও ইউএভি সিস্টেম সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান। চীনের জে-১০সিই ফাইটার বিমান কেনার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে নেগোসিয়েশন মিটিংয়ের খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ এ বিষয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান এবং প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: এফওপিএল দ্রুত চালু না হলে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের ঝুঁকি বাড়বে
জাহেদ উর রহমান বলেন, চলতি অর্থবছরে প্রয়োজনীয় বাজেট পাওয়া গেলে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। তা সম্ভব না হলে পরবর্তী বাজেটে এগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। চীনের তৈরি জে-১০ ফাইটারের সক্ষমতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের বাস্তব অভিজ্ঞতায় চীনের জে-১০ ফাইটারের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তার দাবি, ওই সংঘাতে ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় জে-১০ ফাইটারের ভূমিকা ছিল।
তিনি বলেন, রাফালকে ৪.৫ প্রজন্মের আধুনিক ফাইটারগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর বিপরীতে চীনের তৈরি মাল্টি রোল ফাইটার জে-১০ বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ বিষয়টির দিকে গুরুত্ব দিয়ে এগোচ্ছে। রাফাল কিংবা ইউরোফাইটার টাইফুনের মতো ইউরোপীয় ফাইটারগুলোর তুলনায় একই ধরনের সক্ষমতার চীনা ফাইটারের দাম তুলনামূলকভাবে কম। ফলে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যয় ও কার্যকারিতা দুই দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হলে দলের নিবন্ধন বাতিল হতে পারে
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বৈদেশিক ও সামরিক নীতিতে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। এর অংশ হিসেবেই জে-১০ ফাইটার কেনার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা সম্ভব হচ্ছে। অতীতে ৫ আগস্টের আগে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না। এখন বাংলাদেশ তার নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে এই অর্থেই অনেকে বর্তমান সময়কে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতার সঙ্গে এর কোনো তুলনা চলে না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। চীনের জে-১০সিই এত আলোচনায় কেন
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এই তথ্য দেওয়ার পর বিমানটি নিয়ে প্রতিরক্ষা সচেতন মানুষের মধ্যে কৌতূহল বেড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধবিমান পেলে বাংলাদেশের আকাশ সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। জানা গেছে, চীনের তৈরি চেংদু জে-১০সি বর্তমানে দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একক-ইঞ্জিন বহুমুখী যুদ্ধবিমান। এর রপ্তানি সংস্করণের নাম জে-১০সিই। আকাশযুদ্ধ, ভূমি ও সমুদ্রের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা—একই বিমান দিয়ে একাধিক ধরনের অভিযান চালানোর জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে। আধুনিক রাডার, দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত অ্যাভিওনিকস এবং তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়ের কারণে জে-১০সিইকে অনেক সময় পশ্চিমা ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের বিকল্প হিসেবে দেখা হয়।
জে-১০ কোন ধরনের যুদ্ধবিমান?
জে-১০সিই হলো চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপ-এর তৈরি একক-ইঞ্জিনের সুপারসনিক বহুমুখী যুদ্ধবিমান। এর নকশার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মূল ডানার সামনে ছোট আকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ পাখা রয়েছে এবং মূল ডানা ডেলটা আকৃতির। এই নকশা বিমানটিকে উচ্চ গতিতে ভালো নিয়ন্ত্রণ ও দিকপরিবর্তন করতে সাহায্য করে।
উন্নত অস্ত্র বহন সক্ষমতার কারণে সামরিক মহলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে চীনের সুপারসনিক, বহুমাত্রিক যুদ্ধবিমান জে-১০সি ফাইটার জেট। জে-১০ ফাইটার জেটের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে জে-১০সি প্রথম জনসমক্ষে আনা হয় ২০১৭ সালের জুলাইয়ে। এটি চীনের তৃতীয় প্রজন্মের সুপারসনিক ফাইটার। উন্নত এভিওনিক্স সিস্টেম এবং বিভিন্ন অস্ত্রের সমন্বয়ে এটি স্বল্প ও মাঝারি পাল্লায় কার্যকর। একই সাথে, এটি ভূমি ও সমুদ্র উভয় লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে।
জে-১০সিতে একটি ‘বাম্প এয়ার-ইনলেট সিস্টেম’ আছে। জে-১০-এ ছিল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্লেটসহ একটি এয়ার ইনটেক সিস্টেম। জে-১০সির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে এর অস্ত্র বহনের সক্ষমতায়। যেখানে জে-১০ যুদ্ধবিমানে রাখা যেত ১০টি অস্ত্র। জে-১০সিতে রাখা যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ৪০টিরও বেশি অস্ত্র। পুরনো জে-১০ যুদ্ধবিমানের তুলনায় নতুন জে-১০সি হলো প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক আধুনিক। জে-১০সি-এর রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম এবং অস্ত্র—সবকিছুই একদম নতুন প্রজন্মের হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।
জে-১০সি আর জে-১০সিই-এর পার্থক্য কী?
জে-১০সি হলো চীনের নিজস্ব বিমানবাহিনীর জন্য ব্যবহৃত সংস্করণ। জে-১০সিই হলো এর বিদেশে বিক্রির জন্য তৈরি সংস্করণ। চীনের বিমানবাহিনী ২০১৮ সালের এপ্রিলে জে-১০সি-কে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধকালীন দায়িত্ব পালনে নেয়। চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তখন জানায়, বিমানটি উন্নত অ্যাভিওনিকস এবং বিভিন্ন আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত এবং আকাশ, স্থল ও সমুদ্রের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম।
আলোচনায় থাকার পেছনের কারণ
জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি অনেক কম জায়গায় ‘টেক অফ’ করতে পারে।
অর্থাৎ, শত্রুপক্ষ হামলা করলে জে-১০সিই যুদ্ধবিমান অনেক কম সময়ে (রিঅ্যাকশন টাইম) স্বল্প জায়গার মধ্যে ‘টেক অফ’ করতে পারে। রানওয়ের একটি অংশে শত্রুপক্ষ বোমা হামলা করলেও এই যুদ্ধবিমান অন্য অংশ থেকেই টেক অফ করতে পারবে।
এছাড়া, এই যুদ্ধবিমান সিঙ্গেল ইঞ্জিন ফাইটার। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ম্যানুভারিং, অর্থাৎ ‘টপ ফাইট’ বা উঁচুতে যুদ্ধ করা যায়। টপ ফাইটের সময় দ্রুতগতিতে প্রচুর টার্নিং নিতে হয়। দ্রুত আকাশে ওঠার ক্ষমতা এই টপ ফাইটে প্রয়োজন। এই যুদ্ধ বিমান এমনভাবে ডিজাইন করা যাতে বিশ্বের প্রায় অধিকাংশ ম্যানুভারিং করা সম্ভব। অর্থাৎ শত্রুপক্ষের বিমানকে সহজে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব এই বিমান দিয়ে।
আকাশ থেকে আকাশে এবং ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপ করা উভয় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রকেই এই জে-১০সিই যুদ্ধবিমান সহজে ফাঁকি দিতে সক্ষম এর অ্যারো ডায়নামিকস ডিজাইনের কারণে। এই যুদ্ধবিমান ‘মাল্টিরোল’ ভূমিকাও পালন করে, অর্থাৎ ডিফেনসিভ এবং অফেনসিভ দুই ধরনের কাজই এই যুদ্ধবিমানের মাধ্যমে করা যাবে। এছাড়া, এই যুদ্ধবিমানের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো শব্দের চেয়ে দ্বিগুণ এর গতিবেগ। অর্থাৎ এই বিমানটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় দুই হাজার ৪১৫ কিলোমিটার।
রাফাল এবং জে-১০সি দুটিই চার দশমিক পাঁচ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, কিন্তু রাডারের ক্ষেত্রে জে-১০সি বিমান রাফালের চেয়ে শক্তিশালী বলে ধারণা করা হয়। বিমানবাহী রণতরী এবং ভূমিতে থাকা ঘাঁটি থেকে পরিচালনা করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এই যুদ্ধবিমান।





