নিয়ন্ত্রণহীন শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যে শীতলক্ষ্যা নদী মারাত্মকভাবে দূষিত
শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, ময়লা ও পলিথিনের আগ্রাসনে ক্রমেই মৃতপ্রায় হয়ে উঠছে শীতলক্ষ্যা নদী। বিষাক্ত দূষণের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ অংশে শীতলক্ষ্যার বর্তমান চিত্র স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর পানি কালচে রঙ ধারণ করেছে। নদীর ওপর ভাসছে প্লাস্টিক, পলিথিন ও বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা। আশপাশে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানাগুলো থেকে কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এক সময় যে শীতলক্ষ্যা নদী ছিল এই জনপদের প্রাণ,আজ সেই নদীই হয়ে উঠেছে বিষাক্ত দূষণের উৎস।
আরও পড়ুন: দৌলতপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ শিক্ষার্থীর মৃত্যু
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান,একটি নদীকে কুলষিত করা মানে পুরো মানবজাতির ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া। এক সময় এই নদীতে প্রচুর সুস্বাদু মাছ পাওয়া যেত এবং নদীঘেঁষা মানুষ নির্বিঘ্নে তাদের দৈনন্দিন কাজ চালাতে পারত। অথচ বর্তমানে প্রকাশ্যেই প্রশাসনের নাকের ডগায় নদীতে শিল্পবর্জ্য ফেলা হচ্ছে। তারা শিল্পকারখানাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিয়মিত নজরদারির দাবি জানান।
রূপগঞ্জ থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী বাছির উদ্দিন বাচ্চু বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন,এক সময় শীতলক্ষ্যা নদীর পানি ছিল ব্যবহারযোগ্য ও তুলনামূলক পরিষ্কার। নদীকে ঘিরেই এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা আবর্তিত হতো। কিন্তু এখন একের পর এক শিল্পকারখানা কোনো নিয়ম-নীতি না মেনে বর্জ্য ফেলছে। ফলে নদীর পানি ভয়াবহভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। এই দূষণ শুধু পরিবেশ ধ্বংস করছে না, মানুষের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকেও বড় ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শীতলক্ষ্যা নদীকে আর বাঁচানো সম্ভব হবে না।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি-জামায়াতের তীব্র লড়াই
নৌকার মাঝি নিতাই চন্দ্র দাস বলেন,এই নদীই আমাদের বাঁচার একমাত্র অবলম্বন। আগে নদীতে মাছ থাকত, যাত্রীও বেশি পাওয়া যেত। এখন নদীর পানি এতটাই নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে গেছে যে মানুষ নৌকায় উঠতেও অনীহা প্রকাশ করে। মাছ কমে গেছে, আয়ও কমে গেছে। নদী নষ্ট হয়ে গেলে আমাদের মতো মাঝি ও জেলেদের জীবিকা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে।
সাংবাদিক ইমরান ভূইয়া বলেন,শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ আজ শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। নদীর পানির কারণে আশপাশের মানুষ চর্মরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নিয়মিত মনিটরিং ও কঠোর আইন প্রয়োগ না থাকায় শিল্পকারখানাগুলো নির্বিঘ্নে নদীতে বর্জ্য ফেলছে। প্রশাসনের সমন্বিত ও দৃশ্যমান উদ্যোগ ছাড়া এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম জয় বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন,রূপগঞ্জ উপজেলায় এক লক্ষেরও বেশি ছোট-বড় শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব কারখানার একটি বড় অংশে এখনো ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) নেই। ফলে উৎপাদনের পর নির্গত তরল ও কঠিন বর্জ্য কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে পড়ছে। এর ফলেই নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে শীতলক্ষ্যা আজ প্রায় মৃত অবস্থায় পৌঁছেছে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা ইতোমধ্যে কারখানাগুলোর তালিকা প্রস্তুত করছি এবং যেসব প্রতিষ্ঠানে ইটিপি নেই বা নিয়ম অনুযায়ী ইটিপি চালু নেই, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। অবৈধভাবে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।শীতলক্ষ্যা নদী রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান করতে, যাতে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকা আবার ফিরিয়ে আনা যায়।
স্থানীয়দের দাবি, শীতলক্ষ্যা নদী রক্ষায় অবিলম্বে শিল্পবর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে, প্রতিটি কারখানায় ইটিপি বাধ্যতামূলকভাবে চালু রাখতে হবে এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে শীতলক্ষ্যা নদী কেবল নামেই থাকবে, বাস্তবে পরিণত হবে একটি মৃত নদীতে।





