শেখ হাসিনার আসনে ভোট যুদ্ধে জিলানী ও গোবিন্দ প্রামাণিক

Any Akter
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

গোপালগঞ্জ-৩ (টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া) আসনে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম উত্তেজনা। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানী এবং হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব, স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের স্পষ্ট আভাস মিলছে।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এ আসনটি ছিল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক আধিপত্যের এলাকা। ঐতিহাসিকভাবে এটি দেশের অন্যতম হাই প্রোফাইল আসন হিসেবে পরিচিত। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর এবার শেখ হাসিনাকে ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে ভোটের মাঠ এখন উন্মুক্ত।

আরও পড়ুন: দুমকির ভোটকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডের চেষ্টা, দুই কিশোরের তৎপরতায় বড় ক্ষতি রক্ষা

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এই প্রথমবারের মতো গোপালগঞ্জ-৩ আসনে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে বিএনপির সামনে। নির্বাচনের আর মাত্র তিন দিন বাকি থাকতেই ধানের শীষ ও ঘোড়া প্রতীকের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াইয়ের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

জাতীয় রাজনীতিতে পোড়খাওয়া নেতা এস এম জিলানীর জন্য এবারের নির্বাচন মর্যাদার লড়াই। শেখ হাসিনার আসনে ধানের শীষকে বিজয়ী করে নতুন ইতিহাস গড়ার হাতছানি তার সামনে। অপরদিকে, হিন্দু মহাজোট নেতা গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের কাছে এটি অস্তিত্বের লড়াই। এস এম জিলানীর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নাকি গোবিন্দ প্রামাণিকের স্থানীয় আবেগ ও সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক—কোনটি জিতবে, তা নিয়ে ভোটারদের কৌতূহলের শেষ নেই।

আরও পড়ুন: বরিশালে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়ে দুই প্রার্থীর লিখিত অভিযোগ

কোটালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়ার সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এস এম জিলানী এ অঞ্চলের রাজনীতির এক পরিচিত মুখ এবং একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথমবারের মতো ধানের শীষের পক্ষে এলাকায় জনজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

এস এম জিলানীর শক্তির জায়গা হলো জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব, সুসংগঠিত দলীয় কাঠামো এবং তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় নেতা-কর্মীরা। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে তিনি তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা কর্মসূচির বার্তা ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। নিয়মিত গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, জানাজা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সরব উপস্থিতি তাকে মাঠে এগিয়ে রেখেছে।

অন্যদিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ বর্তমানে নেতৃত্বহীন ও বিভ্রান্ত অবস্থায় রয়েছে। মামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে দলটির নেতা-কর্মীরা নিষ্ক্রিয় থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আরও জোরালো হয়েছে। এতে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন এস এম জিলানী।

তবে এ আসনের ফল নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বিশাল সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক। মোট ভোটের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট একতরফা হলে ফলাফল যে কোনো মুহূর্তে পাল্টে যেতে পারে বলে মনে করছেন ভোটাররা।

এই ভোটব্যাংকে ভাঙন ধরাতে এস এম জিলানী জোর দিচ্ছেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থানে। অন্যদিকে গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের সম্পৃক্ততাকে তার প্রধান শক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছেন। স্থানীয় না হয়েও তিনি বড় চমক হয়ে উঠেছেন এবং নিজেকে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরছেন।

বিলের রাণী খ্যাত কোটালীপাড়া উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত গোপালগঞ্জ-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৮৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪০৫ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৫০ হাজার ৩৭৮ জন এবং একজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মোট আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে মাঠের লড়াই মূলত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এস এম জিলানী ও গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের মধ্যেই। স্থানীয় ভোটার রবীন্দ্র নাথ অধিকারী বলেন, গোপালগঞ্জ-৩ আসনের নির্বাচন এখন আর একমুখী নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগের বিশাল সাইলেন্ট ভোট কোন দিকে যাবে।

এদিকে সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর মধ্যে নির্বাচন পরবর্তী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে অনেক ভোটার পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দেওয়ার প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন।

এস এম জিলানী বলেন, কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলে মৌসুমি বেকারত্ব বড় সমস্যা। বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই তার প্রধান লক্ষ্য। অন্যদিকে গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক জানান, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ও অধিকার আদায়ে কাজ করবেন।

সব মিলিয়ে গোপালগঞ্জ-৩ আসনে কে নতুন ইতিহাস গড়বেন—তার উত্তর মিলবে আর মাত্র তিন দিনের অপেক্ষায়।