অবশেষে বিলুপ্ত র্যাব
এসআরবি আইনের প্রজ্ঞাপন জারি, অপরিবর্তিত লোগোর নকশা
- বিলুপ্ত র্যাবের প্রায় সবই আছে নতুন আইনে
- গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বাহিনীটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল
- মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কলঙ্কিত বাহিনীর কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না
বিরোধী দলের আপত্তির মুখে অবশেষে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ২০২৬’ আইনের প্রজ্ঞাপন গেজেটে প্রকাশ করেছে সরকার। এর মধ্য দিয়ে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি নামে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হয়েছে। মঙ্গলবার এ-সংক্রান্ত নতুন আইনের গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। এর পরদিন বুধবার থেকে নতুন নামে কার্যক্রম শুরু করেছে বাহিনীটি। এর আগে নানা কর্মকাণ্ডে বাহিনীটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। তবে ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের ঘটনায় র্যাবকে ‘কিলিং স্কোয়াড’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
গেজেটে বলা হয়েছে, দেশের জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের মাধ্যমে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখতে পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিশেষায়িত বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব প্রয়োজন বিবেচনায় বিদ্যমান র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি গঠনের জন্য আইন করা হয়েছে বলে গেজেটে উল্লেখ করা হয়।
আরও পড়ুন: স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপলক্ষে সারাদেশে ১১৪টি ভেন্যুতে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ শুরু
গতকাল বুধবার নতুন নামে কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাহিনী প্রধান আহসান হাবীব পলাশ। তিনি বলেন, "এসআরবি নামে গেজেট হয়েছে। আমরা র্যাবের নাম পরিবর্তন করে এসআরবি নাম দিয়ে সকল কাজ আজ থেকে শুরু করেছি।" এদিন এসআরবির সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্রে ব্যবহৃত লোগোতেও পরিবর্তন দেখা গেছে। সেখানে র্যাবের স্থলে ‘এসআরবি বাংলাদেশ’ লেখা হয়েছে। তবে লোগোর মূল নকশা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও নতুন নামের লোগো ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
এর আগে, বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যে গত ১০ সেপ্টেম্বর র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ নামে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়। মঙ্গলবার গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তা আইনে পরিণত হয়। পরদিনই নতুন নামে কার্যক্রম শুরু করে বাহিনীটি। ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন গঠিত হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন অভিযানে সাফল্যের পাশাপাশি বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও ওঠে। এসব অভিযোগে বিভিন্ন সময় র্যাব বিলুপ্তির দাবি জানানো হয়। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র্যাব এবং বাহিনীর সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
আরও পড়ুন: সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ সাময়িক বরখাস্ত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর বিএনপি গঠিত পুলিশ প্রশাসন সংস্কারবিষয়ক কমিটি র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। তবে ক্ষমতায় এসে বিএনপি র্যাব পুরোপুরি বিলুপ্ত না করে এর কাঠামো ও কর্মপরিধি পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি নামে পুলিশের অধীনে বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার র্যাব বিলুপ্ত করে বিলটি সংসদে পাস হয়। বিল পাসের আলোচনায় বিরোধী দল বলেছে, এই আইনের মধ্য দিয়ে শুধু র্যাবের ‘সাইনবোর্ড’ বদল হচ্ছে। এটি নতুন বোতলে পুরোনো মদ। র্যাব সামনে আসছে এসআরবির মোড়কে। অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই আইন পাসের মধ্য দিয়ে র্যাব বিলুপ্ত হচ্ছে। র্যাবের সঙ্গে এসআরবির কোনো সংস্পর্শ নেই।
এসআরবি বিলে বলা হয়েছে—র্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকে রাখা অর্থ, দায়, চুক্তি, স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্রসহ সব দলিল এসআরবির কাছে স্থানান্তর হবে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আগের কাঠামো ঠিক রেখে যেভাবে বিল পাস হলো, তাতে কাগজে-কলমেই শুধু র্যাবের নাম বিলুপ্ত হবে। র্যাবের অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে জাতিসংঘ, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে বাহিনীটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র্যাব এবং বাহিনীটির তৎকালীন ও সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এরই ধারাবাহিকতায় র্যাব বিলুপ্তির উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায় বর্তমান সরকার। তবে র্যাব বিলুপ্ত করে একই কাঠামোতে এসআরবি গঠনে মন্ত্রিসভায় আইনের খসড়া পাস হওয়ার পর থেকে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার জন্য সংসদে তোলেন। বিলটি নিয়ে জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়ে আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দলের সদস্যরা। বিরোধী দলের আপত্তিগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হওয়ার পর বিলটি সংসদে পাস হয়।
এসআরবি বিলে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর আওতাধীন এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে। সরকারের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে পুলিশ, শৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা, আর্মড পারসোনেল বা কর্মচারী পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এ ইউনিট গঠিত হবে। ইউনিটের কর্মকর্তা বা আর্মড পারসোনেল বা কর্মচারীদের পদবিন্যাস, নিয়োগ পদ্ধতি ও চাকরির শর্তাবলি বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। ইউনিটের জন্য বিধি দ্বারা নির্ধারিত একটি পতাকা, প্রতীক ও সুনির্দিষ্ট পোশাক থাকবে। এসআরবির মহাপরিচালক হবেন পুলিশে কর্মরত একজন অন্যূন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক।
র্যাবের কাঠামো নিয়ে সমালোচনার অন্যতম প্রধান জায়গা ছিল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ব্যবহার। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ও মানবাধিকারকর্মীরা নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হলে তা শুধু প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে এসআরবিতে পুলিশের বাইরে অন্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রেষণ বা অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। ‘শৃঙ্খলা বাহিনী’র সংজ্ঞায় সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদের উল্লেখ থাকায় সশস্ত্র বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমান) সদস্যদেরও এসআরবিতে নেওয়ার সুযোগ থাকছে।
নতুন আইনে বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান ২০০৫ সালের বিধিমালায় র্যাবসংক্রান্ত বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা বা আদালতের কার্যধারা বহাল থাকবে। এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও রাখা হয়েছে। তবে বিলের আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, "এই বাহিনীর বিলুপ্তি ছিল সবার দাবি। বেগম খালেদা জিয়াও বারবার এ বিষয়ে কথা বলেছেন। দেশি-বিষয়ী মানবাধিকার সংস্থাগুলো কথা বলেছে। এটা বিলুপ্ত করে আরেকটা বাহিনী গঠনের দাবি কারোরই ছিল না। শুধুই বিলুপ্তির দাবি ছিল।"
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, "আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি যে সরকারি তরফ থেকে ঠিক একই ধরনের আরেকটা বাহিনী বিল্ড আপ করার দাবি নিয়ে আসা শুধু হয়নি, হুবহু বাহিনীটাকে জায়গায় রেখে সবকিছু জায়গায় রেখে, একটা প্রস্তাবনা নিয়ে আসা হয়েছে।" বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, "এই আইনটা কোনো অবস্থাতেই পাস করা উচিত নয়। আইনটা ফিরিয়ে নেওয়া দরকার।" তিনি আশা করেন, জনগণের মনোভাবের প্রতি এবং বাস্তব অভিব্যক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে সরকার এ বিল প্রত্যাহার করবে। পরবর্তী সময়ে চিন্তাভাবনা করে আনতে হলে তখন আনবে।
বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, র্যাব নিয়ে তাঁদের আতঙ্ক আছে। এই বাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, গুমে একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ ধরনের একটা বিল তড়িঘড়ি করে মাত্র চার কর্মদিবসের মধ্যে পাস করার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের ঘটনা তুলে ধরে বিরোধী দলের সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, সে ঘটনার পরে র্যাবকে ‘কিলিং স্কোয়াড’ আখ্যা দিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সে সময় তিনি র্যাবের বিলুপ্তির দাবি জানান। ২০১৯ সালে তিনি র্যাবকে ‘ক্যানসার’ আখ্যায়িত করেছিলেন। নাজিবুর রহমান বলেন, বিলের ২৭ ধারায় বলা হয়েছে, র্যাবের জনবল, কার্যালয়, ক্ষমতা, নথিপত্র, সম্পদ, চুক্তি, দায়দায়িত্ব সরাসরি এসআরবি নামের নতুন বাহিনীর কাছে চলে যাবে। অর্থাৎ শুধু সাইনবোর্ডটাই পরিবর্তন হচ্ছে, নতুন বোতলে পুরোনো মদ। র্যাবের নাম ছাড়া আর কোনো কিছু পরিবর্তন হচ্ছে না। এতে গুমের অপরাধসহ অনেক অপরাধের মামলা এবং তদন্ত ত্রুটির মুখে পড়বে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল র্যাব বিলুপ্ত করা, সেটা করা হচ্ছে। এই বিল যতই বিলম্বিত হবে, র্যাবের অস্তিত্ব ঠিকই রয়ে যাবে, র্যাবই রয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিলটি সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। এর আগে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দীর্ঘদিন ছিল। বিভিন্ন মতামত এসেছে। এই আইন পাসের মধ্য দিয়ে র্যাব বিলুপ্ত করা হচ্ছে।





