শুধু শিশু নয়, হামে বড়রাও আক্রান্ত হচ্ছে
হাম উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ছাড়িয়েছে ২৮ হাজার: স্বাস্থ্য অধিদফতর
#১৫ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল মোট রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৫৯ জন
#হাম ও এজাতীয় উপসর্গে ষোড়শিরো নয় বড়রাও আক্রান্ত হচ্ছে, তার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে
আরও পড়ুন: তীব্র গরমে শিশু-বয়স্কদের ঝুঁকি বেশি, সুস্থ থাকতে চিকিৎসকদের বিশেষ পরামর্শ
রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের পঞ্চম তলায় হাম নিয়ে ভর্তি আছেন ৩৫ বছর বয়সী ঝর্ণা আক্তার। রামপুরার বাসিন্দা ঝর্ণা গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ ১০৩ ডিগ্রি জ্বর, মাথাব্যথা ও পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত হন। এর একদিন পরই শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। প্রথমে অ্যালার্জি ভেবেছিলেন, কিন্তু পুরো শরীর র্যাশে ভরে গেলে এবং শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়লে গত শনিবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষায় ধরা পড়ে তিনি হামে আক্রান্ত।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ঝর্ণা আক্তার বলেন, প্রথমে ভেবেছিলাম অ্যালার্জি। পরে জ্বর ও দুর্বলতা বাড়লে হাসপাতালে আনা হয়। আনার সময় আমার জ্ঞান ছিল না বলেই শুনেছি। পরিবারের বা পরিচিত কারও হাম হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে আমার এক ভাগ্নির হাম হয়েছিল। সে সুস্থ হওয়ার পর তাকে নিয়ে একদিন বক্ষব্যাধি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। এর পরদিনই অসুস্থ হয়ে পড়ি। একই ফ্লোরের ২৯ নম্বর বেডে পাঁচ দিন ধরে ভর্তি আছেন ২১ বছর বয়সী মো. সোহেল। রাজধানীর শনিরআখড়ার এই সিএনজি মিস্ত্রির পুরো শরীর র্যাশে ভরে গেছে। বড় বোন রুমি আক্তার ভাইয়ের শরীর মুছে দিচ্ছিলেন। সোহেলের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ভাইটা গতকাল থেকে খুব অসুস্থ। শরীরে র্যাশের কারণে ভীষণ চুলকাচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, গত তিন দিন ধরে ও চোখ খুলতে পারছে না। দুই চোখ পুরো লাল হয়ে গেছে। ডাক্তার চোখের ওষুধ দিয়েছেন, কিন্তু কোনো উন্নতি হচ্ছে না। একটু সামনেই চিকিৎসাধীন আছেন ৩২ বছর বয়সী মানিক হোসেন এবং ২৯ বছর বয়সী আব্দুস সালাম। সাভার থেকে আসা মানিককে গত শুক্রবার ভর্তি করান স্ত্রী সুলতানা বেগম। তিনি বলেন, গত বুধবার থেকে প্রচণ্ড জ্বর আর পাতলা পায়খানা। এনাম মেডিকেলে নিয়ে গেলে শরীরে র্যাশ দেখা দেয়, তখন তারা এখানে পাঠিয়ে দেয়। এখনও জ্বর ও পাতলা পায়খানা আছে। শরীর এতটাই দুর্বল যে ও বসে থাকতে পারছে না।
আরও পড়ুন: হামের উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, মোট মৃত্যু ৪৩
অন্যদিকে, আব্দুস সালামের ভাই আল আমিন জানান, বৃহস্পতিবার থেকে ভাইয়ের প্রচুর জ্বর। গাজীপুর তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজে নিয়ে গেলেও উন্নতি না হওয়ায় এখানে আনা হয়েছে। সালামও গত দুই দিন ধরে চোখ খুলতে পারছেন না এবং কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পঞ্চম তলায় ৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রায় ১২০ জন হাম রোগী ভর্তি আছেন। এছাড়া, চতুর্থ তলায় ২ থেকে ৮ বছর বয়সী ১০৯ জন শিশু এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় দুই বছরের কম বয়সী ৩০৩ জন শিশু হাম নিয়ে চিকিৎসাধীন। বয়স্ক ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা জানান, এখানে ৩০ বছরের বেশি বয়সী অনেক রোগী আছেন। বর্তমানে হামের জন্য ৯ ও ১৫ মাসে যে এমআর টিকা দেওয়া হয়, তা এই বয়সী ব্যক্তিদের পাওয়ার কথা নয়। কারণ, তখন এই টিকার প্রচলন ছিল না। তবে, অনেক রোগী পাওয়া যাচ্ছে যারা হামের দুই ডোজ টিকাই নিয়েছেন। টিকা নেওয়ার পরও কেন তারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তা নিয়ে সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ গবেষণা প্রয়োজন। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকার কারণেই এরা সহজে আক্রান্ত হচ্ছেন। হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ১৫ মাস বয়সী শিশু সাইফকে নিয়ে চার দিন ধরে ভর্তি আছেন মা আছিয়া আক্তার। তিনি বলেন, ছেলেকে সব টিকা দেওয়া হয়েছে। এই মাসেই ১৫ মাস পূর্ণ হলো, আরেকটি টিকা নেওয়ার তারিখ আছে। কিন্তু হঠাৎ গত বৃহস্পতিবার থেকে জ্বর আর কাশি শুরু হয়। এক দিন পর শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। মিডফোর্ট হাসপাতালে নিলে বাচ্চার হাম হয়েছে বলে এখানে পাঠিয়ে দেয়। তিনি বলেন, ডাক্তাররা বলেছেন ওর নিউমোনিয়া নেই, শুধু জ্বর-কাশি আর হাম। দুই দিন ধরে কিছু খেতে পারছে না। আমাদের আশেপাশে কারও হাম হওয়ার খবর শুনিনি, আর গত দুই সপ্তাহে বাচ্চাকে নিয়ে তেমন বাইরেও যাইনি। তারপরও কেন ওর হাম হলো, বুঝতে পারছি না। দায়িত্বরত চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এমন রোগী আছে, যারা এক বা দুই ডোজ এমআর টিকা নিয়েছে। টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্তদের অধিকাংশেরই নিউমোনিয়া কিংবা ডায়রিয়ার মতো জটিলতা দেখা যাচ্ছে।
এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল ইপিআই সার্ভিল্যান্সের এক সাম্প্রতিক জরিপে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। হাম-সন্দেহে দুই হাজার ৩১০ জন শিশুর ওপর চালানো জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এদের মধ্যে ৫৪.৭ শতাংশ শিশু কোনো টিকাই নেয়নি। ২২ শতাংশ শিশু প্রথম ডোজ (এমআর-১) নেওয়ার পরও হামে আক্রান্ত হয়েছে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২৩.২ শতাংশ শিশুকে হামের পূর্ণ দুই ডোজ (এমআর-১ ও এমআর-২) দেওয়ার পরও তাদের শরীরে হামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়া নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ৭৫১ জনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৭১.৮ শতাংশ শিশু টিকা নেয়নি (এর মধ্যে ৪৯ শতাংশ শিশুর টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি)। ১৭ শতাংশ শিশু এক ডোজ টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হয়েছে। আর ১১.২ শতাংশ শিশু হামের পূর্ণ টিকাদান কর্মসূচি সম্পন্ন করার পরও হামে আক্রান্ত হয়েছে।
হাম ও উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ছাড়িয়েছে ২৮ হাজার: দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নিশ্চিত হামে একজন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চারজনসহ মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত দেড় মাসে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৩৩৪ জনে। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১৭০ জন। আর ১৫ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত এই সংখ্যা ২৮ হাজার ৩৩৪ জন। একই সময়ে গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১২৫ জন। ১৫ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫৯ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮ হাজার ৮৪৫ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৫ হাজার ৭২৮ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মোট ৩৯ জনের মৃত্যু হলো। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, একই সময়ে হাম সন্দেহে মৃত্যু হয়েছে ১৯৪ জনের। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন চারজন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। শিশুদের মধ্যে এর প্রকোপ বেশি হলেও যে কেউ এতে আক্রান্ত হতে পারেন। হঠাৎ জ্বর, শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ, চোখ লাল হওয়া এবং কাশির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি সম্পন্ন করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।





