ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে ইরানের শাসকরা

Sanchoy Biswas
বিবিসি বাংলা
প্রকাশিত: ৫:৩২ অপরাহ্ন, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৫:৩২ অপরাহ্ন, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এখন সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে ইরানের শাসকগোষ্ঠী। এই সংকট মোকাবিলায় তারা নজিরবিহীন ব্যবস্থা নিয়েছে।

তারা দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা অভিযান চালাচ্ছে এবং প্রায় পুরোপুরিভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। এর আগের কোনো সংকটেই তাদেরকে এমনটা করতে দেখা যায়নি।

আরও পড়ুন: ইরানে বিক্ষোভ দমন অভিযানে ২হাজার মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা

দেশটির যেসব সড়কে কিছুদিন আগেও সরকারবিরোধী স্লোগানের গর্জন শোনা যাচ্ছিলো, সেগুলো এখন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে।

"শুক্রবার ইরানের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। সেদিন অবিশ্বাস্যরকমের ভিড় ছিল, আর ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ শোনা গিয়েছিলো। কিন্তু শনিবার রাত থেকে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত," বিবিসি পার্সিয়ানকে বলেন তেহরানের এক বাসিন্দা।

আরও পড়ুন: পাকিস্তান–তুরস্ক–সৌদি সামরিক জোটে বাংলাদেশের যোগদান পরিকল্পনা

একজন ইরানি সাংবাদিকের ভাষায়, "এখন রাস্তায় নামা মানে মৃত্যুকে আহ্বান করা।"

ইরানের এবারের সংকট শুধু দেশের ভেতরের বিক্ষোভেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাইরের চাপও।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। আর এটি তিনি দিচ্ছেন এমন এক সময়ে, যখন মাত্র সাত মাস আগে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে টানা ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিলো। ওই সংঘাত ইরানের শাসনব্যবস্থাকে স্পষ্টভাবে দুর্বল করে দেয়।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই পরিস্থিতি ইরানের হাতে আরেকটি তাস তুলে দিয়েছে। অর্থাৎ, ইরান এখন আলোচনার টেবিলে ফিরতে আগ্রহী।

কিন্তু বাস্তবে ইরানের অবস্থান খুব একটা শক্ত নয়। কারণ ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কোনোপ্রকার বৈঠকের আগেই তিনি যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন। তাই আলোচনা শুরু হলেও এই বিক্ষোভের উত্তাপ বা ক্ষোভ পুরোপুরি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের যেসব কঠোর শর্ত রয়েছে, বিশেষ করে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি, ইরান কোনোভাবেই এটি মানতে রাজি নয়। এসব শর্ত ইরানের ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার নিরাপত্তা ও কৌশলগত মূলনীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

এদিকে, এই ধরনের চাপের মাঝেও ইরানের শাসকগোষ্ঠী যে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসছে, তার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক এবং 'ইরান'স গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি' বইয়ের লেখক ভালি নাসর বলেন, ইরানের শাসকদের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো আগে কঠোরভাবে দমন করে সংকটময় সময়টা কোনোভাবে পার করা। পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে তারা ভাববে যে ভবিষ্যতে তারা কোন পথ ধরে এগোবে।

তিনি আরও বলেন, "কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান যেভাবে চাপে আছে, তাতে সরকার এখন এই বিক্ষোভ দমন করতে পারলেও ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করার মতো বাস্তবসম্মত কোনো বিকল্প তাদের হাতে নেই।"

এই সপ্তাহটিই হয়তো ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির গতিপথ ঠিক করে দিতে পারে। ইরান এবং তার আশেপাশের অঞ্চল আবার নতুন করে সামরিক হামলার দিকে যাবে কি না, কিংবা অতীতের মতো কঠোর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই বিক্ষোভ দমন করা হবে কি না, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।

এর মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আজ তেহরানে কূটনীতিকদের জানিয়েছেন যে পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

দিনের আলোয় তেহরানের রাস্তায় জনতার ভিড় দেখা গেছে। কারণ বিক্ষোভকারীদের দখলে থাকা রাস্তাগুলো ফিরিয়ে নিতে সরকার যে আহ্বান জানিয়েছিলো, তাতে সাড়া দিয়ে এসব মানুষ সেখানে জড়ো হয়। তারা মূলত সরকারেরই সমর্থক।

দেশটির মানুষ আজ পাঁচদিন ধরে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে। কিন্তু এরপরও স্টারলিংক স্যাটেলাইট সংযোগ, ইরানিদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সাহসের কারণে সেখানকার অভ্যন্তরীণ ভয়াবহতার খবর ধীরে ধীরে বাইরে আসছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের চাপ সামলাতে না পেরে হাসপাতালগুলো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, খোলা জায়গায় অস্থায়ী মর্গ, যেখানে কালো ব্যাগে মোড়া অসংখ্য মরদেহ সারিবদ্ধভাবে রাখা।

বিবিসি পার্সিয়ান সার্ভিসের সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো ভয়েস নোটে উঠে আসছে মানুষের আতঙ্ক ও বিস্ময়ের কথা।

পরিস্থিতি যত এগোচ্ছে, নিহত ও গ্রেফতারের সংখ্যা ততই বাড়ছে। এর আগে, ২০২২ ও ২০২৩ সালে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে আন্দোলন চলে ইরানে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে, তখন প্রায় ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছিলো এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়।

কিন্তু এবার আন্দোলন শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে সেই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে, এখন পর্যন্ত ২০ হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।

সরকারও এই রক্তপাত অস্বীকার করছে না। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও অস্থায়ী মর্গের ছবি সম্প্রচার করা হচ্ছে এবং সেখানে স্বীকার করা হচ্ছে যে কিছু বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।

ইরানের রাস্তাগুলোতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কিছু সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে। এগুলো শাসনব্যবস্থার প্রতীক বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে জনসম্পত্তিতে হামলা চালানো কোনো আন্দোলনের অংশ নয়, বলছে সরকার। সরকারের দাবি, এসব হামলা 'সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাবাজরা' চালাচ্ছে, যারা বিক্ষোভকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এবার আইনি ভাষা আরও কঠোর হয়ে উঠেছে। কারণ "ভাঙচুরে জড়িতদের" বিরুদ্ধে "স্রষ্টার বিরুদ্ধে যুদ্ধ" করার মতো গুরুতর অভিযোগ এনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা চলছে সেখানে।

ইরানের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জন্য মূলত বিদেশি শত্রুদের দায়ী করছে সরকার। বিদেশি শত্রু বলতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকেই বোঝানো হচ্ছে।

গত বছর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ইরানে ব্যাপক অনুপ্রবেশের প্রমাণ সামনে আসার কারণে ইরানের ওই অভিযোগ এবার আরও বেশি জোরালো হয়েছে।

ইরানে প্রতিবার নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিলে কিছু সাধারণ প্রশ্ন উঠে আসে। বিক্ষোভ কতটা বিস্তৃত? কারা রাস্তায় নামছে? কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে?

ইরানের এই সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কয়েক কারণে অন্য সময়ের চেয়ে আলাদা।

এর শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ। গত ২৮শে ডিসেম্বর তেহরানে আমদানি করা ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রেতারা হঠাৎ মুদ্রার বড় ধরনের পতনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তারা দোকানপাট বন্ধ করে ধর্মঘটে যান এবং বাজারের অন্য ব্যবসায়ীদেরও এতে যোগ দিতে আহ্বান জানান।

সরকারের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল দ্রুত এবং আপসকামী। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলার আশ্বাস দেন। কারণ ইরান এমন এক দেশ যেখানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৫০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন সাধারণ মানুষের জীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত। তাই, প্রেসিডেন্ট মানুষের ওই 'যৌক্তিক দাবি' হিসেবে আখ্যা দেন।

এর কিছুদিন পরই সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য সবার ব্যাংক হিসাবে নতুন একটি মাসিক ভাতা দেওয়া হয়, যার পরিমাণ প্রায় সাত ডলার। কিন্তু তাতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়নি। দ্রব্যমূল্য আরও বেড়ে যায় এবং বিক্ষোভের ঢেউ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

সেই বিক্ষোভের তিন সপ্তাহও না যেতেই ইরানের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ রাস্তায় নামতে শুরু করে। ইরানের ছোট ও বঞ্চিত প্রাদেশিক শহর থেকে শুরু করে বড় বড় নগর, সর্বত্রই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি শোনা যায়।

এখন আর এর কোনো দ্রুত ও সহজ সমাধান নেই। কারণ সমস্যা পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই।

বছরের পর বছর ধরে চলা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অপশাসন ও দুর্নীতি, ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর কড়াকড়ি নিয়ে মানুষের মনে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের ভার ইরানকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

তবু এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রটি টিকে আছে বলে মনে হচ্ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক কার্নেগি এনডাউমেন্টের সিনিয়র ফেলো করিম সাজ্জাদপৌর বলেন, একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা পুরোপুরি পতনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এখানে এখনো অনুপস্থিত। আর তা হলো, বিক্ষোভ দমনকারী বাহিনীর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যে তারা আর এই শাসনব্যবস্থা থেকে লাভবান হচ্ছে না এবং এর জন্য তারা আর মানুষ হত্যা করতেও রাজি নয়।

এই সংকট শুরু হওয়ার আগেই ইরানের ক্ষমতাসীন মহলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে তীব্র মতবিরোধ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা আদৌ আবার শুরু হবে কি না এবং গাজা যুদ্ধের সময় ইরানের সামরিক মিত্র ও অংশীদারদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার পর কীভাবে কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়েও মতভেদ ছিল।

তবে সব মতভেদের ঊর্ধ্বে একটি বিষয়ে সবাই একমত। তা হলো, তাদের ব্যবস্থাকে টেকানো।

চূড়ান্ত ক্ষমতা এখনো ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা অসুস্থ আয়াতোল্লাহ খামেনির হাতেই রয়েছে। তার সবচেয়ে অনুগত শক্তিগুলো তাকে ঘিরে আছে। যার মধ্যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী অন্যতম। এই বাহিনী এখন ইরানের অর্থনীতি, রাজনীতি ও নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব রাখছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রায় প্রতিদিনের হুমকি শীর্ষ নেতৃত্বকে নতুন করে সতর্ক করে তুলেছে। একই সঙ্গে বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রভাব নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

এখন যদি বাইরে থেকে ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ হয়, তা বিক্ষোভকারীদের মনে সাহস ও ভরসা জোগাতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এই ধরনের পদক্ষেপ উল্টো ফলও দিতে পারে।

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, বাইরের চাপ বা হস্তক্ষেপ ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ভাঙার বদলে উল্টোভাবে শাসকগোষ্ঠীর শীর্ষ মহলকে আরও একজোট করে দিতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানানো ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তি হলেন নির্বাসিত সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভি। তার বাবা ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবে ইরানের শাহ হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত হন। যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ চাওয়ার এই আহ্বান এবং ইসরায়েলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ইরানের ভেতরে-বাইরে তাকে নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

অন্যদিকে ভিন্নমতও রয়েছে। শান্তিতে নোবেল জয়ী নারগেস মোহাম্মদি, যিনি এখনো ইরানে কারাবন্দি এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহিসহ অনেকেই মনে করেন, পরিবর্তন আসতে হলে তা হতে হবে শান্তিপূর্ণ এবং দেশের ভেতর থেকেই।

চলমান এই অস্থিরতায় আন্দোলনকে সংগঠিত করতে এবং একটি দিকনির্দেশনা দিতে রেজা পাহলভি দেখিয়েছেন যে ইরানে তার কিছুটা প্রভাব আছে।

গত সপ্তাহের শুরুতে তিনি একযোগে স্লোগান দেওয়ার আহ্বান জানান। তখন দেখা গেছে, কনকনে শীত উপেক্ষা করে আরও বেশি মানুষ রাস্তায় নেমেছে।

তবে তার প্রতি বাস্তবিক সমর্থন ঠিক কতটা, তা বলা কঠিন। এখন ইরানে অনেক মানুষের মধ্যেই পরিবর্তনের জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। সেই কারণে কেউ কেউ পরিচিত বা পুরোনো কোনো প্রতীকের দিকে ফিরে তাকাচ্ছেন, যেটা তাদের কাছে আশার প্রতীক বলে মনে হচ্ছে। তবে এরই মধ্যে সিংহ ও সূর্য-খচিত ইরানের বিপ্লব-পূর্ব পতাকা আবার রাস্তায় দেখা যাচ্ছে।

পাহলভি বারবার জোর দিয়ে বলছেন, তিনি ইরানে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে চান না। তার দাবি, তিনি ইরানকে গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যাওয়ার একটি রূপান্তরের নেতৃত্ব দিতে চান। তবে অতীতে দেখা গেছে, তিনি বিভক্ত ইরানি প্রবাসী সমাজকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে সফল হননি।

এদিকে, অনেক ইরানির মনে করছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে দেশটিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে ও অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়তে পারে। এমনকি যারা এখনো ক্ষমতাসীন ধর্মীয় নেতাদের সমর্থন করেন, তাদের মধ্যেও এই ভয় রয়েছে। তাই অনেকের ভাবনায় বিপ্লব নয়, বরং ধীরে ধীরে সংস্কারের পথই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইতিহাস থেকে দেখা যায়, রাস্তায় যখন মানুষের আবেগ এবং রাষ্ট্রের শক্তি মুখোমুখি হয়, তখন ক্ষমতার ওপরের স্তর থেকেও পরিবর্তন আসতে পারে। আবার পরিবর্তন নিচ থেকে, অর্থাৎ জনগণের চাপেও আসতে পারে।

তবে সেই পরিবর্তনের পরিণতি কখনোই নিশ্চিত নয় এবং তা প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।