ককরোচ আন্দোলনে দিল্লী রণক্ষেত্র

সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগে ছত্রভঙ্গ, ইন্টারনেট বন্ধ

Sanchoy Biswas
বিবিসি বাংলা
প্রকাশিত: ৯:১৭ অপরাহ্ন, ২০ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৯:১৭ অপরাহ্ন, ২০ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ককরোচ জনতা পার্টির 'সংসদ চলো' অভিযান ঘিরে দিনভর উত্তপ্ত রইল দিল্লির প্রাণকেন্দ্র। চলল টিয়ার গ্যাস, পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়ালেন আন্দোলনকারীরা।

কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চেয়ে ককরোচ জনতা পার্টি ২০শে জুলাই সংসদ ভবন অভিযানের ডাক দিয়েছিল। এই ডাকে সাড়া দিয়ে রোববার ১৯শে জুলাই রাত থেকেই অভিযানের জন্য জড়ো হতে শুরু করেছিলেন ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা আন্দোলনকারীরা।

আরও পড়ুন: সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দিতে যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া চুক্তি

সোমবার, ২০শে জুলাই থেকে ভারতের সংসদে শুরু হয়েছে বর্ষাকালীন অধিবেশন। এই দিনটিকেই তাদের বার্তা দেওয়ার জন্য বেছে নিয়েছিল অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি।

সম্প্রতি ভারতের চিকিৎসাক্ষেত্রে ভর্তির পরীক্ষা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় সারা দেশ থেকে ২১ জন ছাত্রছাত্রীর আত্মহত্যার খবর মিলেছে। এর দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে ইস্তফা দিতে হবে, এই দাবিতেই আন্দোলন শুরু করে ককরোচ জনতা পার্টি।

আরও পড়ুন: মার্কিন ভিসা আবেদনকারীদের নতুন সতর্কবার্তা

ভারতের সংসদে বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংসদ ভবনের দিকে এগোতে শুরু করেন আন্দোলনকারীরা।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার সঙ্গে সাক্ষাতে যান এই সংগঠনটির দুজন প্রতিনিধি।

ভারতের রাজধানী দিল্লির প্রাণকেন্দ্র অর্থাৎ যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবন যাওয়ার পথে সুরক্ষা ব্যবস্থা আঁটসাঁট করা হয়েছিল সকাল থেকেই। উপস্থিত ছিল সশস্ত্র কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনী সিআরপিএফ ও ব়্যাপিড অ্যাক্শন ফোর্স বা ব়্যাফ।

পুলিশের হাতে কাঁদানে গ্যাস তো মজুত ছিলই, সঙ্গে ছিল জলকামান, সাঁজোয়া গাড়ি, পিকআপ ভ্যান এবং ব্যারিকেড।

রোববারই দিল্লি পুলিশ একটি বিবৃতি দিয়ে জানায় যে কোনও রকম মিছিলের অনুমতি চাওয়া হয়নি এবং দিল্লি পুলিশ কোনও মিছিলের অনুমতি দেয়ওনি। ফলে যে কোনও জমায়েত ও মিছিলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে পারে দিল্লি পুলিশ।

অন্যদিকে এই সব আয়োজন উপেক্ষা করেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ প্রথমে জড়ো হয়েছিলেন যন্তর মন্তরে অনশন মঞ্চের কাছে।

ঐ প্রতিবাদ মিছিলে উপস্থিত এক ছাত্রী সুনিষ্কা রায়চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে জানালেন, "নিট পরীক্ষায় যারা বসেন, তারা বছরের পর বছর রাত জেগে পড়াশোনা করেন। সেখানে পরীক্ষা বাতিল হয়ে গেলে ছাত্ররা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে।"

কলকাতার বেহালা থেকে প্রতিবাদে অংশ নিতে দিল্লি পৌছেছেন ঈশিতা দত্ত, বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "এতজন বাচ্চা আত্মহত্যা করেছে, এটা কোনও ছোটো কথা নয়। দেশের যুবসমাজ প্রতিবাদ করলেই তাদের বার বার 'দেশবিরোধী' বলে দমিয়ে দেওয়া হয়েছে কিন্তু তারা আর ভয় পায় না।"

সকাল দশটায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণের মাধ্যমে সূচনা হয় সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন। তখনই যন্তর মন্তর থেকে পার্লামেন্ট ভবনের দিকে এগোতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। প্রথমেই তারা পুলিশের লাঠি চার্জের মুখোমুখি হন।

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছিলেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং গত ২১ দিন ধরে অনশনরত শিক্ষাকর্মী ও পরিবেশ বিষয়ক আন্দোলনকারী সোনাম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো।

প্রতিবাদ মিছিলে বিবিসি বাংলা গিয়ে দেখতে পায় যে, রাইসিনা রোডের উপর যে ব্যারিকেড, তা টপকিয়ে প্রতিবাদী জনতা পৌছে গেছে জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাছে।

বেলা গড়াতেই আন্দোলনকারীরা পৌঁছিয়ে যান সংসদ ভবনের কাছে রেল ভবন পর্যন্ত। সেখানে আগেই ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রেখেছিল পুলিশ। সেখানে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোঁড়া হয়। প্রায় ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

একদিকে যখন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছেন ককরোচ জনতা পার্টির সদস্যরা, তখন দিল্লির যন্তর মন্তরে কেরালা হাউসের সামনে পুলিশের দ্বারা সোনাম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমোর উপর পুলিশি হেনস্থার অভিযোগ ওঠে।

সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ এই কথা জানিয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র সৌরভ দাস।

এছাড়াও তিনি দুপুর দু'টো পঞ্চাশ মিনিট নাগাদ লেখেন যে মুখ্য আন্দোলনকারী অভিজিৎ দীপকেকে পুলিশ 'তুলে নিয়েছে', অবশ্য পরে তিনিই জানান যে অভিজিৎ দীপকেকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি। কেরালা হাউসের সামনে বহু মানুষের জমায়েত হয়েছে।

এর পরেই দিল্লি পুলিশ একটি এক্স পোস্টে জানায় যে অভিজিৎ দীপকেকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি। দিল্লিবাসীদের গুজবে কান না দিতে অনুরোধ করে পুলিশ।

দুপুর ১২টা নাগাদ ককরোচ জনতা পার্টির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও মুখপাত্র সৌরভ দাস সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ জানান যে তারা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন।

শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার কাছে হলফনামা জমা দিয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির দুই প্রতিনিধি সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা।

সেই হলফনামায় তারা তিনটি দাবি করেছেন, সোনাম ওয়াংচুককে হাসপাতাল থেকে দ্রুত মুক্তি দেওয়া, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা ও আত্মহত্যা করা প্রত্যেক নিট পরীক্ষার্থীর পরিবারকে এক কোটি টাকা করে সহায়তা প্রদান।

বিকেল ৪টে ২২ নাগাদ ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান যে, জেপি নাড্ডা তাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে যন্তর মন্তরে প্রতিবাদস্থলে পুলিশি সক্রিয়তা কমানো হবে।

যদিও সৌরভ দাস জানিয়েছেন, দাবি পূরণ হওয়া না পর্যন্ত আন্দোলনে রাশ টানা হবে না।

সিজেপির দাবিকে সমর্থন জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চেয়ে অনশনে বসেছিলেন সোনাম ওয়াংচুক। ১৮ই জুলাই সকালে তাকে দিল্লি পুলিশের একটি দল ধর্ণা মঞ্চ থেকে তুলে ভর্তি করে দেয় দিল্লির সরকারি সফদরজং হাসপাতালে।

এই ঘটনার পর থেকে তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই প্রতিবাদ কর্মসূতে।

ভারতের অন্যতম দুর্গম অঞ্চল লাদাখে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও পানীয় জলের ব্যবস্থার জন্য একাধিক কাজ করার জন্য সুপরিচিত সোনাম ওয়াংচুক।

পরিবেশ ও শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদানের জন্য ২০১৮ সালে তাকে র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার দেওয়া হয়। এই পুরস্কারকে অনেকে এশিয়ার নোবেল বলেও আখ্যা দিয়ে থাকেন।

ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বান সমর্থন করে ২৮শে জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন আন্দোলনে বসেন তিনি।

১৮ই জুলাই তাকে দিল্লি পুলিশ কর্তৃক তুলে নিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তার প্রায় ৯ কিলো ওজন কমে গিয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন অভিজিৎ দীপকে।

সোনাম ওয়াংচুককে জোর করে পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে উঠে আসেন তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো। তিনি অভিযোগ করেছেন, সোনাম ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়ে মিথ্যাচার করছে দিল্লির সফদরজং হাসপাতাল।

যদিও হাসপাতাল এই অভিযোগকে নস্যাৎ করেছে।

গীতাঞ্জলি আংমো সংবাদমাধ্যমকে বলেন, "এই সরকার জনবিরোধী, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলবে।"

সোনাম ওয়াংচুককে ধর্ণাস্থল থেকে হাসপাতালে স্থানান্তর করার পর থেকেই অনশনে বসেছিলেন অভিজিৎ দীপকে।

আলোচনায় রাজি হওয়ায় সোনাম ওয়াংচুক অভিজিৎ দীপকেকে অনুরোধ করেছেন তার অনশন ভঙ্গ করার জন্য।

যদিও সোনাম ওয়াংচুকের অনশন এখনও চলছে বলেই জানিয়েছেন তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো।

মনোজ তিওয়ারির মতো কয়েকজন বিজেপি নেতা এই প্রতিবাদকে 'দেশের উন্নয়নকে বাধা দেওয়ার প্রয়াস' বলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন।

একই কথা বলেছেন বিজেপির অন্যতম কেন্দ্রীয় মুখপাত্র শাহনওয়াজ হুসেন। তিনি বলেন, "রাহুল গান্ধী ও বিরোধী দলের নেতারা এভাবে দেশের রাজনীতি অস্থিতিশীল করে তুলতে ককরোচ জনতা পার্টির সাহায্য নিচ্ছে।"

তিনি আরও বলেন, "নিট সংক্রান্ত যে সব অভিযোগ ছিল, তার ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। দেশের যুবসমাজ সরকারের উপর ভরসা রাখে।"

যন্তর মন্তরে অনশন ধর্ণা শুরুর পরে সোনাম ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন বহু বিরোধী দলের নেতা।

বিরোধী দলের নেতাদের বার বার এই ধর্ণাস্থলে যাওয়ায় এই প্রতিবাদ আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে কটাক্ষ করেছেন বিজেপির আইটি ও সোশ্যাল মিডিয়া সেলের প্রধান অমিত মালভিয়া।

তবে ২০ তারিখের প্রতিবাদ মিছিল থেকে গীতাঞ্জলি আংমো বলেন, "ওরা (সরকার) এই বিক্ষোভকে যথাযথভাবে মান্যতা দিচ্ছে না। যদি সরকার দায়িত্বশীল হয়, তবে তাদের উচিত প্রতিবাদকে না আটকানো কারণ এভাবেই তারা মানুষের কথা শুনতে পাবেন।"

"আমাদের দাবি, শিক্ষাই হোক এই বছরের বর্ষাকালীন অধিবেশনের মুখ্য আলোচ্য বিষয়। এই দাবি নিয়েই আমরা এসেছি, এবং ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে যারা নষ্ট করছেন তাদের পদ থেকে না সরালে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা কখনোই উন্নত হবে না"

দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতেই দেখা গেল শুধু সংসদ ভবন চত্বর নয়, প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে দিল্লির অন্যত্রও।

যন্তর মন্তরে নিজেই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অভিজিৎ দীপকে, অন্যদিকে দিল্লির কেতাদূরস্ত শপিং ডেস্টিনেশন বলে পরিচিত রাজীব চক, যা পুরোনো নাম কনট প্লেস নামেই বেশি পরিচিত, সেখানেও জড়ো হয়েছেন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ছাত্র যুবরা।

ছাত্র যুবদের বিক্ষোভে যানজট পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে কনট প্লেস অঞ্চলে।

এছাড়াও অশোকা রোড সহ মধ্য দিল্লির একাধিক জায়গায় এখনও ছাত্র ও যুবরা জমায়েত রয়েছেন বলে খবর মিলেছে।

একটি ভিডিও বার্তায় দিল্লিবাসীদের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আবেদন করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার রাজীব রঞ্জন।