৭ অক্টোবরের হামলার আগে নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:৫১ অপরাহ্ন, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৪:৫১ অপরাহ্ন, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের বড় ধরনের অভিযানের পরিকল্পনা সম্পর্কে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে কয়েক সপ্তাহ আগেই সতর্ক করেছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। আসন্ন একটি বইয়ের জন্য করা অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রায় ৪৫ মিনিটের এক ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে এই সতর্কবার্তা দেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট। তবে নেতানিয়াহু বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও সামরিক নেতৃত্বকে এ সম্পর্কে অবহিত করেননি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: উপসাগরের নিরাপত্তায় শুধু মার্কিন সেনা যথেষ্ট নয়: কাতার

ওই ফোনালাপে উপস্থিত ছিলেন আমিরাতের শাসকের ঘনিষ্ঠ একজন উপদেষ্টা, যিনি গাজায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ বিন জায়েদ নেতানিয়াহুকে জানিয়েছিলেন যে তার মূল্যায়ন অনুযায়ী হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার একটি বড় ধরনের অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ওই উপদেষ্টা বলেন, বিন জায়েদ ইসরায়েলকে সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে গাজার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সমাধান এবং পশ্চিম তীরে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছিলেন, যাতে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে না যায়।

আরও পড়ুন: রাশিয়ায় তুষারধসের ঘটনায় ১১ পর্বতারোহী নিহত

হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সিনওয়ার ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের কাছে ‘কয়লা চোখ’ নামে পরিচিত ফাতাহর এক মধ্যস্থতাকারীকে জানিয়েছিলেন, ইসরায়েলের একটি ‘ভূমিকম্পের’ জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।

সে সময় গাজায় আটক ইসরায়েলিদের বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির বিষয়ে একটি কমিটির বৈঠক বারবার পিছিয়ে দেওয়ায় নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন সিনওয়ার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে কয়েক মাস ধরে হামাস মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে গাজার ওপর অবরোধ ধীরে ধীরে শিথিল করা, অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানো এবং ২০১৪ ও ২০১৫ সাল থেকে গাজায় আটক চার ইসরায়েলিকে মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে আসছিল। ওই চারজনের মধ্যে দুইজন ইসরায়েলি সেনার মরদেহও ছিল। বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির দাবি ছিল।

হারেৎজ জানিয়েছে, সিনওয়ার যখন ‘কয়লা চোখ’-কে বলেন যে তিনি ইসরায়েলের জন্য ‘বিশাল বিস্ময়’ প্রস্তুত করছেন, তখন ওই মধ্যস্থতাকারী বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

পরে তিনি আবুধাবিতে বসবাসকারী গাজা থেকে অভিবাসী এক ফিলিস্তিনির সঙ্গে পরামর্শ করার সিদ্ধান্ত নেন। ওই ব্যক্তি মোহাম্মদ বিন জায়েদের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতেন।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আরেক বৈঠকে সিনওয়ার ওই মধ্যস্থতাকারীকে আরও কঠোর ভাষায় সতর্ক করেন বলে হারেৎজের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তিনি বার্তা পৌঁছে দিতে বলেন যে, তিনি ‘সবচেয়ে বড় বিস্ময়’ প্রস্তুত করছেন—একটি ভয়ংকর ও নজিরবিহীন অভিযান।

সিনওয়ারের এসব বক্তব্য পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কাছেও পৌঁছে যায়। আর এর কিছু অংশই মোহাম্মদ বিন জায়েদের পক্ষ থেকে নেতানিয়াহুকে দেওয়া সতর্কবার্তার ভিত্তি ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হারেৎজ বলেছে, ‘কয়লা চোখ’ নামে পরিচিত ওই মধ্যস্থতাকারী হামাস ও ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত—উভয় পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন।

মিডল ইস্ট আইকে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ‘কয়লা চোখ’ বা কখনো ‘কালো চোখ’ নামে পরিচিত ওই ব্যক্তি হলেন ফাতাহ আন্দোলনের প্রভাবশালী নেতা সুফিয়ান আবু জায়দা। গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া আবু জায়দা ফাতাহর বিপ্লবী পরিষদের সদস্য ছিলেন।

২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে হামাস সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সরকারের বন্দি ও মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

হারেৎজের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ বিন জায়েদের সতর্কবার্তার জবাবে নেতানিয়াহু তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরায়েল প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি মনে করেছিলেন, হামাসের মূল পরিকল্পনা পশ্চিম তীরকে ঘিরে হতে পারে।

এর আগেও ইসরায়েলি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, ৭ অক্টোবরের হামলার কয়েক দিন আগে মিসরের গোয়েন্দারাও নেতানিয়াহু সরকারকে হামাসের সম্ভাব্য বড় হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিল।

ইসরায়েলি দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনোথের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তৎকালীন মিসরীয় গোয়েন্দাপ্রধান আব্বাস কামেল নেতানিয়াহুকে ‘অস্বাভাবিক কিছু, একটি ভয়ংকর অভিযান’ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহু তখন জবাবে বলেছিলেন, গাজা সম্পর্কে ইসরায়েল অবগত এবং পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বরং পশ্চিম তীরকে তারা বড় সমস্যা হিসেবে দেখছে এবং সেখানে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে।

নেতানিয়াহু অস্বীকার 

তবে আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এমন কোনো ফোনালাপ এবং হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা পাওয়ার বিষয়টি নেতানিয়াহু অস্বীকার করেছেন।

এদিকে হারেৎজের অনুসন্ধানে আরও দাবি করা হয়েছে, ৭ অক্টোবর হামলার পরপরই হামাস সব বেসামরিক জিম্মিকে কোনো বিনিময় দাবি ছাড়াই মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 


সূত্র: মিডল ইস্ট আই