সুদানের দারফুরে বাজারে ড্রোন হামলা, নিহত ১০০

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১২:৪০ অপরাহ্ন, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সুদানের পশ্চিমাঞ্চলীয় দারফুরে একটি ব্যস্ত বাজারে সামরিক ড্রোন হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন ইমার্জেন্সি লইয়ার্স। হামলায় আহত হয়েছেন আরও ১১৩ জন।

সোমবার দক্ষিণ দারফুরের নিয়ালা শহরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। শহরটি সুদানের আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) কার্যত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। হামলার সময় বাজারটিতে আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের আনাগোনা ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন: ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা

বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) এক সিগারেট বিক্রেতা জানান, হামলার দিন সন্ধ্যায় বাজারে আরএসএফের শত শত যোদ্ধা জড়ো হয়েছিলেন। তিনি যোদ্ধাদের সমাবেশের ফাঁকে ফাঁকে নিজের দোকান থেকে সিগারেট বিক্রি করছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ৮টার দিকে একটি ড্রোন আঘাত হানে। এতে বহু যোদ্ধার পাশাপাশি খাবার বিক্রি করা কয়েকজন নারীও নিহত হন।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বিস্ফোরণটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। এতে বহু যোদ্ধা প্রাণ হারান। তাঁর ধারণা, নারী ও শিশুসহ প্রায় ১৪ জন বেসামরিক মানুষও নিহত হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই চা ও খাবার বিক্রি করতেন।

আরও পড়ুন: শান্তি আলোচনার আশায় কমল তেলের দাম

প্রতিশোধের আশঙ্কায় দুই প্রত্যক্ষদর্শীই নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।

হতাহতদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তা

হামলায় হতাহতের সঠিক সংখ্যা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। শহরটি থেকে তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা এবং চলমান সামরিক অভিযানের কারণে বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া হিসাবে পার্থক্য রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন ইমার্জেন্সি লইয়ার্সের হিসাবে, সোমবারের হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত এবং ১১৩ জন আহত হয়েছেন। তবে সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক বুধবার প্রাথমিকভাবে ২১ জন নিহত এবং ৪০ জনের বেশি আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, গোলাবর্ষণের কারণে অধিকাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

নিয়ালায় চলমান সামরিক অভিযান, নিরাপত্তাজনিত সীমাবদ্ধতা এবং ঘটনাস্থল থেকে তথ্য সংগ্রহের সমস্যার কারণে হতাহতদের বিষয়ে তথ্য যাচাই করতে দেরি হচ্ছে বলে জানিয়েছে সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক।

অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর পক্ষে লড়াই করা স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সেসের মুখপাত্র মোহাম্মদ দিদান ফেসবুকে দাবি করেছেন, নিয়ালার পশ্চিমে দুমায়া শিবিরে বিমান হামলায় ১৫০ জনের বেশি ‘মিলিশিয়া সদস্য’ নিহত হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাটি ছিল নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে চালানো একটি অভিযান।

বেসামরিক এলাকায় দ্বিতীয় হামলার অভিযোগ

চিকিৎসা সহায়তা প্রদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) জানিয়েছে, বাজারে হামলার পর একটি বেসামরিক আবাসিক এলাকাতেও দ্বিতীয়বার আঘাত হানা হয়।

সংস্থাটির সহায়তাপ্রাপ্ত নিয়ালার একটি হাসপাতালে হামলার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৩৬টি মরদেহ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২১ জনের পরনে বেসামরিক পোশাক ছিল। একই সময়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ১৫০ জনের বেশি আহত মানুষকে চিকিৎসা নিতে দেখেছেন সংস্থাটির কর্মীরা।

এমএসএফ হামলাগুলোকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছে। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, বাজার, বাড়িঘর ও গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো কোনো পক্ষের হামলার লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। সংঘাতে জড়িত সব পক্ষকে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

দারফুরে ত্রাণকর্মী মোবারক বেখেইত জানিয়েছেন, হামলার পরও অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। আশপাশের বাড়িঘর থেকে কিছু মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তাঁর মতে, বেসামরিক একটি এলাকায় হামলার পরও মানুষের মধ্যে নতুন করে বোমাবর্ষণের আতঙ্ক বিরাজ করছে।

তিনি বলেন, যুদ্ধের নির্মমতায় সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। তাঁরা প্রাণ হারাচ্ছেন, স্বজন ও ঘরবাড়ি হারাচ্ছেন এবং প্রতিনিয়ত নতুন হামলার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

দুর্ভিক্ষ ও বাস্তুচ্যুতির সংকট আরও তীব্র

সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে চলমান যুদ্ধ চতুর্থ বছরে গড়িয়েছে। এই সংঘাত দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে চরম দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতি তৈরি করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সুদানে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে ড্রোন হামলা। যুদ্ধের প্রভাবে দেশটির কয়েকটি এলাকায় দুর্ভিক্ষও দেখা দিয়েছে।

জাতিসংঘের চলতি মাসে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, আরএসএফ-নিয়ন্ত্রিত নিয়ালা শহরে গুরুতর তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের মধ্যে আক্রান্তদের অনুপাত জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এ হার ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।