বেগম খালেদা জিয়াকে অভিবাদন জানিয়েছি, বিদায় জানাতে পারিনি: ফরহাদ মজহার
বেগম খালেদা জিয়ার জন্য খোলা শোক বইয়ে আমি তাঁকে অভিবাদন জানিয়েছি। বিদায় জানাতে পারিনি। কারন তিনি থাকবেন, আছেন।
শোক প্রকাশ আমার জন্য সহজ ছিল না। ব্যক্তিগত শোকের ভাষা দিয়ে তাঁর সঙ্গে আমাদের অনেকের আদর্শিক, রাজনৈতিক এবং বাংলাদেশের জনগণের সামষ্টিক কল্যাণ আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ককে ধরা যায় না। সাধ্যানুযায়ী গণমানুষের পক্ষে তিনি নিরাপোষ দাঁড়িয়েছেন, এই কীর্তি তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ স্থান দিয়েছে।
আরও পড়ুন: একুশে পদকপ্রাপ্ত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া আর নেই
তাঁর অসামান্য গুণ ছিল দলের বাইরে সমাজে যারা গণমানুষের পক্ষে কাজ করেন তাদের প্রচেষ্টা আন্তরিক ভাবে বোঝার চেষ্টা। এই গুণের কারণেই আমাদের অনেকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ ও পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
গতকাল বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় আমরা লক্ষ অক্ষ মানুষ তাঁকে বিদায় জানালাম। গণমানুষের এই ভালবাসা তাঁর প্রাপ্য ছিল। ইতিহাস কাউকেই খালি হাতে ফিরিয়ে দেয় না।
আরও পড়ুন: ‘সার্কের চেতনা এখনো জীবিত’, ঢাকা সফররত দক্ষিণ এশিয়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে প্রধান উপদেষ্টা
এটা সত্য, বাংলাদেশকে সামনে আরও কঠিন ও দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে। ইতিহাস বারবার আমাদের সামনে ফিরে আসবে— বিশেষ ভাবে ফিরে আসবেন জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া। আমরা আরেকটি জাতীয় সন্ধিক্ষণ অতিক্রন করছি।
রাজনীতিতে নীতিগত প্রশ্নে বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা ও আপোষহীনতা অবিসংবাদিত। এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নাই যে, বাঙালি জাতিবাদী ফ্যাসিস্ট শক্তি এবং ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ ও অনমনীয় অবস্থান ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্ভব হতো না। তিনি যে গণচেতনার রাজপথ নির্মাণ করে দিয়েছিলেন, সেই পথ ধরেই জুলাইয়ের যোদ্ধাদের আবির্ভাব। মনে রাখতে হবে—আমরা সবাই ইতিহাসের সন্তান। ইতিহাসের ময়দানে কেউ ভুঁইফোড় হাজির হয় না।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি অত্যাচার , অপমান, জেল জুলুমের স্বীকার হয়েছেন কিন্তু মাথা নোয়ান নি। চ্যালেঞ্জ ছিল নিশাল। আশির দশক থেকে বিশ্বব্যাপী‘কাছা খোলা’ অবাধ বাজার ব্যবস্থার উত্থান বা নতুন উদারনৈতিক অর্থনীতির বিস্তার ঘটতে শুরু করে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মূদ্রা তহবিলের কাঠামগত সংস্কারের চাপ তাকে বহন করতে হয়, তাঁর সময়েই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থায় বাংলাদেশ স্বাক্ষর করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী অনন্ত যুদ্ধ বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপির রাজনীতির জন্য ছিল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। কঠিন সময়। এই সময় শুধু রাষ্ট্র নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও গুণগত রূপান্তর ঘটে। এই রূপান্তরকে কেবল জাতীয় রাজনীতির ফ্রেমে নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির আলোকে বুঝতে হবে। এই প্রেক্ষাপটেই সেই সময় উগ্রপন্থা মোকাবিলার কৌশল হিশাবে আমরা বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনে বিশ্বাসী জামায়াতে ইসলামি ও অন্যান্য ইসলামি দলের জোট গঠনের বাস্তবতা দেখেছি। এই জোটে গঠনের জন্য বেগম জিয়া ও বিএনপিকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। এই সময় বাঙালি জাতিবাদী সেকুলার ধারা তাঁর তীব্র সমালোচনা করেছে। এই সময়েই র্যাব গঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশে বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বাদ দিয়ে করা সম্ভব না। কেবল আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধিতার ছাঁচে সেই মূল্যায়ন আটকে থাকলে তা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। বৈশ্বিক বাস্তবতা কীভাবে বিএনপির রাজনীতি সহ সামগ্রিক ভাবে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে সেই বাস্তবতা আমাদের মনে রাখতে হবে।—সেই বিচারক্ষমতা অর্জন ও অতীতের সঠিক মূল্যায়ন আমাদের সামনে এগিয়ে যাবার পথ করে দেবে
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী–জনতার বৈপ্লবিক মৈত্রীর ভিত্তিতে যে অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা ছিল নতুন গণচেতনার উন্মেষ। জিয়াউর রহমান সেই মর্ম বুঝতে এবং ধারণ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর উনিশ দফার কর্মসূচির মধ্যেই তিনি সেই চেতনাকে রাজনৈতিক রূপ দিতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর শাহাদাতের মধ্য দিয়ে সেই ধারার বিকাশে ছেদ পড়ে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, উনিশ দফার রাজনৈতিক মর্ম বিএনপি গণমানুষের চেতনায় সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। তারই অনিবার্য পরিণতিতে বাঙালি জাতিবাদী রাজনীতির ভেতর থেকে সেকুলার ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান ঘটে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি ফ্যাসিস্ট সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হয়। সেই রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক পরিণতিতেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘটে। যার মর্ম দাঁড়ায় জনগণ সকল প্রকার ফ্যাসিবাদ, ফ্যাসিস্ট শক্তি এবং ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে মুক্তি চায়। ।
বেগম খালেদা জিয়া আজ আমাদের মধ্যে নাই। কিন্তু তিনি ইতিহাস থেকে বিদায় নেননি। তাঁর ছাপ—তার শক্তি ও সীমাবদ্ধতা উভয়ই—বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতিতে রয়ে যাবে। এখন সময় নতুনভাবে ভাববার। অন্তত এই নতুন বাস্তবতায়, উনিশ দফার রাজনৈতিক মর্মকে নতুন ভাষায়, নতুন দায়বদ্ধতায়, নতুন ভাবে জনগণের সামনে হাজির করা দরকার। ইতিহাস আমাদের সেই কর্তব্য থেকে মুক্তি দেয় নি। তারেক রহমান ও বিএনপিও এই কর্তব্য ও দায় থেকে মুক্ত নন।
শহিদ জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বোঝার প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ আগ্রহ ছিল। জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধা হিশাবে স্বাধীনতার ঘোষণা অনুযায়ী সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়বার জন্য লড়েছেন। জাতিবাদী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র কায়েম করবার জন্য নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এটাই মর্মকথা। এই মর্ম জিয়ার রহমান এবং খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে তারেক রহমানকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। কারন মনে রাখতে হবে জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দলই মুক্তিযুদ্ধের প্রতিনিধি। ইতিগাস সাক্ষী: জিয়া রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা, শেখ মুজিবর রহমানের রাজনৈতিক অবদান অন্স্বীকার্য, কিন্তু তিনি রণাঙ্গণের যোদ্ধা ছিলেন না।
ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও একদিকে বিএনপি ও মুক্তিযুদ্ধ এবং বিপরীতে জামাত – এন সি পি ও উগ্র ধর্ম পন্থা এই দুই তরফে অনিবার্য ভাবেই বিভক্ত হবে। একে মোকাবিলার পথ কি হতে পারে?
প্রশ্ন হচ্ছে ধর্মকে কিভাবে আমরা আমাদের ঈমান-আকিদা চর্চার ক্ষেত্র ছাড়াও আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক জীবনের অন্তর্গত করে নিতে পারি? ধর্মীয় পরিচয়বাদ বা ধর্মীয় জাতিবাদ সেকুলার বাঙালি জাতিবাদেরই অপর পৃষ্ঠা। খেয়াল রাখতে হবে জাতিবাদী পরিচয়-সর্বস্ব উগ্র রাজনীতি যেন রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিশাব আমাদের বিকশিত হবার পথ আটকে না দেয়। এই দিকটা বোঝার প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার আগ্রহ ছিল প্রচুর। কারন এটা তিনি বুঝতেন ধর্ম বনাম ধর্ম নিরপেক্ষতার বাইনারি ভূয়া দ্বন্দ্ব। নতুন বাংলাদেশ গঠন করতে হলে রাষ্ট্র গঠনের গোড়ার এই আদর্শিক-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে মীমাংসা জরুরি। ধর্মকে জীবন বিচ্ছিন্ন ব্যবহারযোগ্য বস্তুতে পর্যবসিত করবার বিপদ তিনি বুঝতেন, কারণ কাণ্ডজ্ঞানেই তিনি বুঝতেন ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি এবং ধর্ম বিরোধী রাজনীতি উভয়েই ধর্মের ব্যবহার করে, ধর্মকে জীবন্ত মানুষের দৈন্দিন জীবনের মধ্যে সচল ও জীবন্ত নীতি-নৈতিকতার চর্চা হিশাবে দেখে না। ধর্মবাদীরা ধর্মকে বস্তুর মত ব্যবহার করে, সেটা তারা করে ধর্মকে রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করে, আধ্র ধর্ম নিরপেক্ষবাদীরা সেটা করে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিযুক্ত করে। উভয়েই ভ্রান্ত। কারণ উভয়েই ধর্মকে নিছকই ব্যবহারযোগ্য বস্তু গণ্য করে, ধর্মকে মানুষের জীবনের জীবন্ত চর্চা গণ্য করে না। আমাদের জীবনে ধর্ম সচল জীবন্ত চর্চা হিশাবে সদা সর্বদাই জারি রয়েছে। যে কারণে মুক্তি যুদ্ধে আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার বা ইনসাফ কায়েম করতে চেয়েছি। প্রতটি নীতি ইসলামেরও নীতি। স্বাধীনতার ঘোষণাই মর্মের দিক থেকে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমেরই ঘোষণা।
বেগম খালেদা জিয়া আমাদের অনেককে তাঁর দলের বাইরে বুঝতে চেয়েছেন, আমরাও তাঁকে বুঝতে চেয়েছি। সশ্রদ্ধ সৌহার্দ ও কাজের সেই অভিজ্ঞতা আমার পক্ষে বিস্মৃত হওয়া অসম্ভব।





