নতুন ১৫০ গ্যাসকূপ খননের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৭:০৪ অপরাহ্ন, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৭:১৯ অপরাহ্ন, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে নতুন ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে এসব পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।

আরও পড়ুন: শাহজাহানপুরসহ রাজধানীর কয়েক এলাকায় ৮ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না

সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ এক প্রশ্নে জুলাই ২০২৬ সালে একটি এলএনজি টার্মিনাল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক সংকট মোকাবিলায় বিকল্প গ্যাসের উৎস, এলএনজি রিজার্ভ সক্ষমতা, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক অগ্রাধিকার সরবরাহ এবং জরুরি জ্বালানি পরিকল্পনা নেওয়া হবে কি না, জানতে চান তিনি।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আকস্মিক বা সাময়িক সংকটের সময় শিল্পখাত যাতে গ্যাস সংকটে না পড়ে, সে জন্য ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (২ডি) এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ফ্যাসিস্টের হাত থেকে মুক্তি পেতে অনেক বেশি মূল্য দিয়েছি: রাষ্ট্রপতি

এলএনজি অবকাঠামো জোরদারের পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গড়ে দৈনিক প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। ভবিষ্যতে আকস্মিক সংকট মোকাবিলায় মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়িতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম চলছে।

তারেক রহমান বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কুতুবজোমের ভাসমান টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং ল্যান্ড-বেইজড টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ সম্ভব হবে। এছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূল বিবেচনায় সুবিধাজনক স্থানে গভীর সমুদ্রে আরও একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।

ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে ভোলার গ্যাস জাতীয় স্বার্থে ব্যবহারের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে নিয়ে আসার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে। তাই সরকার বিকল্প ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

ভোলায় গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্থানীয়ভাবে গ্যাস ব্যবহার করে শিল্পায়ন হলে একদিকে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে ওই অঞ্চলের অর্থনীতির আকারও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

তিনি জানান, ভোলায় একটি বড় সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সেখানে ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভোলার গ্যাস সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি বিশেষ কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩১ মেয়াদি এ পরিকল্পনায় দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ভোলার আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য, স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ, সাধারণ মানুষের চাহিদা, উপকূলীয় জলবায়ু ঝুঁকি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান সাজানো হচ্ছে।

অন্য এক প্রশ্নে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজউদ্দীন খান দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুৎসহ বিকল্প উৎসের সমন্বিত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জ্বালানি খাতের রূপান্তর নিশ্চিত করতে ২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র’ প্রণয়ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, কৌশলপত্র অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০৩০ সাল নাগাদ বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও সরকারি ভবনের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক বড় সৌরপ্রকল্প থেকে আরও ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সংস্থান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বায়ু বিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সোলার ও কৃষিভিত্তিক অ্যাগ্রিভোলটেইকের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার আমদানি ও শুল্ক কাঠামোয় বিভিন্ন সুবিধা দিয়েছে। সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, বিশেষায়িত ব্যাটারি ও স্ট্রাকচার আমদানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন শুল্ক ও কর ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদন ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত মুনাফা ও প্রিমিয়াম হিসাব করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিক্রির দাম প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫ অনুযায়ী যেসব সাধারণ বা বাণিজ্যিক গ্রাহক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করবেন, তারা নিজস্ব প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত নির্ধারিত হারে সুবিধা পাবেন।

সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগকে কার্যকর করতে বিভিন্ন নীতিমালা ও নির্দেশিকা বাস্তবায়নের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন ভূমিতে পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প তৈরির নির্দেশিকা ২০২৬, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির নীতিমালা ২০২৫, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ এবং হালনাগাদ নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ রয়েছে।

এ ছাড়া জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি ২০২৫, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবসায়িক মডেল, অনশোর উইন্ড গাইডলাইন এবং কার্বন ক্রেডিট প্রক্রিয়াকরণ সংক্রান্ত পথনির্দেশিকা বাস্তবায়নের কথাও জানিয়েছেন সরকারপ্রধান। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।