হেবা আইন সংশোধন, শরিয়াহ বিরোধী নিয়ে বিতর্ক কেন?

Sadek Ali
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৩২ পূর্বাহ্ন, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১১:৩২ পূর্বাহ্ন, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যেই অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে হেবা আইন সংশোধন করেছে। ইসলামী পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞগণ হেবা আইন সংশোধনকে ইসলামী শরিয়াহবিরোধী উল্লেখ করে বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। ধর্মীয় প্রতিনিধিত্বকারী জোট হেফাজতে ইসলাম একাধিক বৈঠক করে সরকারকে আলটিমেটাম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের কাছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকার পরেও ধর্মীয় স্পর্শকাতর ও বিতর্কিত আইনটি তড়িঘড়ি করে সরকারের অগ্রাধিকারের সময়ে সংসদে পাস করে কেন বিতর্কের তৈরি করল।

ইসলামী আইনে হেবা বিষয়ে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো: 

আরও পড়ুন: আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

সম্প্রতি বাংলাদেশে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে হেবা বা গিফটের ক্ষেত্রে এমন একটি নতুন আইনি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তর করার পরও জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন। বিষয়টি শুধু সম্পত্তি আইনের একটি কারিগরি পরিবর্তন নয়। মুসলিম নাগরিকদের ক্ষেত্রে এটি হেবা, কবজা, মালিকানা ও উত্তরাধিকার তথা ইসলামি আইনের কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বাংলাদেশে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর ১৩তম জাতীয় সংসদ কার্যক্রম শুরু করে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা বিভিন্ন অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন ও আইন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের এই সংশোধনটি ২০২৬ সালের নতুন আইন হিসেবে সংসদে পাস হয়। ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়।

আরও পড়ুন: রবিউল আউয়ালের চাঁদ দেখা যায়নি, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) ২৬ আগস্ট

সরকারের আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত সরকারি তালিকায় Transfer of Property (Amendment) Act, ২০২৬-কে ২০২৬ সালের ১০৫ নম্বর আইন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘বাংলাদেশ সরকারের আইনভান্ডারে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (একাডেমি) অ্যাক্ট-২০২৬ (https://reference-url-citation.invalid/1)। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের প্রেসের সরকারি গেজেটেও ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আইনটি প্রকাশিত হওয়ার তথ্য রয়েছে। আইনটির মাধ্যমে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২-এ নতুন সেকশন ১২২-এ এবং সেকশন ১২২-বি সংযোজন করা হয়েছে।

নতুন আইনে কী পরিবর্তন হলো?

নতুন সেকশন ১২২-এ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে যেমন বাবা-মা ও সন্তান, দাদা-দাদি/নানা-নানি ও নাতি-নাতনি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, সম্পত্তি হস্তান্তরের এমন ব্যবস্থা করা যাবে, যেখানে মালিকানা অন্য ব্যক্তির কাছে চলে যাবে, কিন্তু দাতা তার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।

আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় গ্রহীতা মারা গেলে সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে আইন অনুযায়ী চলে যাবে। তবে দাতার জীবনকালীন ভোগের অধিকার বহাল থাকবে। আইনটিকে একটি স্বতন্ত্র ধরনের ট্রান্সফার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

সেকশন ১২২-বিতে এ ধরনের হেবা নিবন্ধনের পর সাধারণভাবে ইরিভোকেবল করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে পারস্পরিক সম্মতি, বিশেষ প্রয়োজন এবং কিছু ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদনের মাধ্যমে পরিবর্তন বা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।

আইনটির উদ্দেশ্য হিসেবে মূলত বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এসেছে। অর্থাৎ, বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার পরও যেন তাদের বসবাস ও ব্যবহার-অধিকার হারিয়ে না যায়, এই বাস্তব সমস্যার একটি আইনি সমাধান তৈরি করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।

ইসলামি আইনের সঙ্গে প্রশ্নটি কোথায়?

এখানে মূল প্রশ্নটি এই নয় যে, কোনো বাবা তার সন্তানকে জীবদ্দশায় সম্পত্তি হেবা করতে পারবেন কি না। হেবা করা ইসলামি শরিয়তে মূলত বৈধ। প্রধান প্রশ্ন হলো, হেবা করার পর যদি গ্রহীতা মালিক হন, কিন্তু সম্পত্তি তার নিয়ন্ত্রণে না আসে এবং দাতা নিজেই সম্পত্তির ব্যবহার, ভোগ ও নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রাখেন, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহীতার ‘কবজা’ বা পূর্ণ মালিকানা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে?

ইসলামি ফিকহে হেবার ক্ষেত্রে কবজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বহু ফকিহের মতে, শুধু হেবা-চুক্তি সম্পন্ন হওয়াই যথেষ্ট নয়। গ্রহীতার কবজা প্রতিষ্ঠিত হলে হেবার মালিকানা পূর্ণতা লাভ করে। এই জায়গাতেই নতুন বাংলাদেশি আইনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতির প্রশ্ন তৈরি হয়।

আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমির অবস্থান

ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকহ একাডেমির (আইআইএফএ) Resolution No. 53 (4/6), ‘Qabḍ (Taking Possession) : Forms and their Rulings’-এ কবজার বিষয়টি স্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে। একাডেমি বলেছে, কবজা শুধু শারীরিকভাবে কোনো বস্তু হাতে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কনস্ট্রাক্টিভ পজেশন বা কবজা হুকমিও হতে পারে। তবে এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, সম্পত্তি গ্রহীতার নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দিতে হবে এবং তাকে সেটির সঙ্গে ইচ্ছামতো লেনদেন করার সুযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ, শুধু কাগজে মালিকানা সৃষ্টি করলেই কনস্ট্রাক্টিভ পজেশন সম্পন্ন হয়ে যায় না। গ্রহীতাকে সম্পত্তির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের সুযোগ থাকতে হবে।

এখানেই বাংলাদেশের নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি টানাপোড়েন দেখা যায়। ধরা যাক, বাবা তার বাড়ি সন্তানের নামে হেবা করলেন। আইন অনুযায়ী সন্তান মালিক হলেন। কিন্তু বাবা নিজের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাড়িতে বসবাস করবেন, বাড়ি ব্যবহার করবেন, এর ভোগ-উপভোগ নিজের কাছে রাখবেন এবং সন্তানের স্বাধীন ব্যবহার কার্যত সীমিত থাকবে।

তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, সন্তান কি বাস্তবে এমন কোনো কবজা পেলেন, যার ভিত্তিতে তিনি সম্পত্তির ওপর পূর্ণ মালিকানা প্রয়োগ করতে পারেন?

আইআইএফএর কবজা-সংক্রান্ত নীতিতে গ্রহীতাকে সম্পত্তি নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাংলাদেশের আইনে যদি গ্রহীতার সেই কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তাহলে আইআইএফএর এই সাধারণ নীতির সঙ্গে একটি স্পষ্ট ফিকহি প্রশ্ন তৈরি হয়।

এএওআইএফআইয়ের শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে প্রশ্নটি আরো স্পষ্ট। এখানে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন্সের (এএওআইএফআই) শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ডের নম্বর : ১৮ ‘Possession (Qabd)’, বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এএওআইএফআই সেখানে স্থাবর সম্পত্তির অ্যাকচুয়াল পজেশন সম্পর্কে বলেছে—‘স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে কবজা প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি হলো, পূর্ববর্তী মালিকের পক্ষ থেকে সম্পত্তি ছেড়ে দেওয়া এবং নতুন মালিককে ওই সম্পত্তিতে লেনদেন করার সক্ষমতা দেওয়া।’

এখন বাংলাদেশের নতুন আইনের সঙ্গে বিষয়টি তুলনা করলে প্রশ্নটি আরো স্পষ্ট হয়। নতুন আইনে একদিকে গ্রহীতার কাছে মালিকানা হস্তান্তর হচ্ছে। অন্যদিকে দাতা তাঁর জীবদ্দশায় সম্পত্তির ব্যবহার ও ভোগের অধিকার ধরে রাখছেন। তাই ফিকহি বিশ্লেষণের প্রশ্ন হচ্ছে, দাতা যদি সম্পত্তির দখল ও ব্যবহার পুরোপুরি নিজের কাছে রাখেন এবং গ্রহীতা যদি সম্পত্তির ওপর স্বাধীনভাবে লেনদেন করতে না পারেন, তাহলে এএওআইএফআইয়ের উল্লিখিত ‘রিলিংকুইশমেন্ট অ্যান্ড ইনেবলিং ট্র্যানজ্যাকশন্স’র শর্ত কীভাবে পূর্ণ হবে? এখানেই নতুন আইনের সঙ্গে এএওআইএফআইয়ের কবজা-সংক্রান্ত স্ট্যান্ডার্ডের ফিকহি অসামঞ্জস্যের প্রশ্ন তৈরি হয়।

তাহলে কি নতুন আইন সম্পূর্ণ শরিয়তবিরোধী?

মিসরের দারুল ইফতা ১০ নভেম্বর ২০২০ তারিখে ‘নাসের ব্যাংকে শর্তযুক্ত হেবার বিধান’ শিরোনামে একটি বিস্তারিত ফতোয়া দেয়। ফতোয়া নম্বর ৫১২৬। বিষয়টি ছিল নাসের সোশ্যাল ব্যাংকের (Nasser Social Bank) একটি শর্তযুক্ত হেবাব্যবস্থা। সেখানে এমন শর্ত রাখা হয়েছিল, বাবা সন্তানকে সম্পদ হেবা করবেন, কিন্তু বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত সন্তান সম্পত্তির ওপর স্বাধীনভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। বাবা নিজে সম্পদের ওপর কিছু অধিকার ব্যবহার করতে পারবেন এবং মৃত্যুর পর হেবা গ্রহীতার পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। সেখানে দারুল ইফতা এই ধরনের শর্তযুক্ত হেবাকে জায়েজ বলেছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা হেবার চুক্তি এবং কবজা ও পূর্ণ মালিকানা প্রতিষ্ঠা—এ দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখেছে।

ফতোয়ায় বলা হয়েছে, হেবার চুক্তি হতে পারে, কিন্তু কবজা ও হস্তান্তর দাতার অনুমতির ওপর নির্ভর করে। তারা বিশেষভাবে পরামর্শ দিয়েছেন, ‘গ্রহীতার হাতকে সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ থেকে বন্ধ রাখা’ এই ভাষার পরিবর্তে এমন ভাষা ব্যবহার করা ভালো যে ‘দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত হস্তান্তর বিলম্বিত করা এবং কবজা স্থগিত রাখা।’ দারুল ইফতার যুক্তিটি হলো, এতে হেবার চুক্তি এবং কবজা দুটিকে পরস্পরবিরোধীভাবে উপস্থাপন না করে একটি স্বীকৃত ফিকহি কাঠামোর মধ্যে রাখা যায়।

বাংলাদেশের আইনের সঙ্গে দারুল ইফতার পার্থক্য কোথায়?

‘দাতার মৃত্যু পর্যন্ত কিছু অধিকার নিজের কাছে রাখা’—এই ধারণাটিকে দারুল ইফতা একেবারে অগ্রহণযোগ্য বলে দেয়নি। বরং তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিষয়টিকে কবজা ও মালিকানার ফিকহি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। দারুল ইফতা নিজেই এমন একটি কাঠামো গ্রহণ করেছে, যেখানে হেবা-চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে, কিন্তু দাতার জীবদ্দশায় তাসলিম ও কবজা বিলম্বিত রাখা যেতে পারে।

অতএব, দেশের বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম বিষয়টি আরো গবেষণা করে সরকারকে তাদের সুচিন্তিত মতামত জানাবেন বলে আশা করি।

লেখক: গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক