আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে উদ্বেগ বাড়ছে জনমনে

Any Akter
শামসুজ্জামামন শামস
প্রকাশিত: ৬:৩৯ অপরাহ্ন, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৭:৪৬ অপরাহ্ন, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ এআই
ছবিঃ এআই

# আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা  কঠোর হস্তে দমন করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

# রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তাসনিম জারার

আরও পড়ুন: জ্বালানি তেল মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কাঁচাবাজার ও গণপরিবহনে

# দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ক্ষমতাসীন দলের জন্য অশনিসংকেত: টিআইবি

# এসব অপরাধ সরকারের জন্য ‘ওয়েক-আপ কল’: আসিফ নজরুল

আরও পড়ুন: প্রতারণার নিত্য নতুন কৌশলে সর্বস্বান্ত হচ্ছে মানুষ

# মবতন্ত্রের অভিযোগ আসিফ মাহমুদের


গণঅভ্যুত্থানের পর যে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন দেশের মানুষ দেখেছিল, তা লাগামহীন দখলদারিত্ব, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির ঘটনায় ম্লান হতে বসেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বাভাবিকতা কোনভাবেই ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, লুটপাটসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অপরাধে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েই চলেছে। নির্বাচিত সরকার নেওয়ার পর জনমনে স্বস্তি ফিরে এলেও নানা কায়দা-কৌশলে লুটপাটের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় এবং কিছু ক্ষেত্রে জনগণের নাম ভাঙ্গিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী আইন হাতে তুলে নেওয়ায় আরো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। নির্বাচিত সরকারের গত সাত মাসে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও জনমনে এখনো আস্থা তৈরি করতে পারেনি। পুলিশ ঘুরে দাঁড়াতে উদ্যোগী হলেও সরকারের নানামুখী সিদ্ধান্তহীনতায় অস্থিরতা কাটছে না পুলিশ বাহিনীতে। রাজনৈতিক ও অপরাধ সমাজ বিশ্লেষণগণ এখনও রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। গত কয়েক দিনে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নতুন করে অবনতি এবং বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্য দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনা জনমনে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা চিকিৎসাকেন্দ্রে বর্বরোচিত হামলা ও ভাঙচুর, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলমহাল ও জমি দখলের চেষ্টা মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তাহীনতাকে আবারও সামনে এনেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিইবি) এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন এই অব্যাহত দখল ও চাঁদাবাজিকে সরকারের জন্য এক ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইনি প্রক্রিয়াকে তোয়াক্কা না করার এই প্রবণতা এবং পুলিশের দৃশ্যমান নিষ্ক্রিয়তা দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পুলিশ ঘুরে দাঁড়াতে উদ্যোগী হলেও সরকারের নানামুখী সিদ্ধান্ত  হীনতায় অস্থিরতা কাটছে না পুলিশ বাহিনীতে। রাজনৈতিক ও অপরাধ সমাজ বিশ্লেষণ এখনো রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ  ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। বিশেষ করে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট মোহাম্মদপুর ধানমন্ডি ও যাত্রাবাড়ী  এলাকায়  চাঁদাবাজি দখলবাজির কর্মকান্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতায় জনমনে আলোচনা শুরু হয়েছে আসলেই আইন শৃংখলার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওইসব এলাকায় হচ্ছেটা কি।  আর পুলিশের এবং ক্ষমতাসীন দলেরই ভূমিকা কি?  বিশেষ করে গত ৫০ বছর ধরে ট্রাস্টের মাধ্যমে শিশুদের টিকা দিয়ে আসা রাড্ডা হসপিটাল দখল মালামাল লুট ও সালমান মুক্তাদির স্টুডিও হামলা ভাঙচুর লুটপাটের ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে পুলিশ পরবর্তী ব্যবস্থা নিলেও সারাদেশেই বালু লুট দখল চাঁদাবাজির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। স্বৈরাচার অ্যাসিস্ট  দোসরদের ধরার নামে রাজধানীর পাড়া মহল্লাসহ সারা দেশেই বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যানারে তল্লাশি আটক মব সরকারি বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা জনগণের ভীতি তৈরি করেছে।

রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিও ভাঙচুর ও ওই জমিতে হামলার ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল রবিবার বিকেলে ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, স্টুডিওর জমির মালিক নিউ গিনি প্রপার্টিজ লিমিটেড এবং এলাকার অন্য জমির মালিকদের মধ্যে বিরোধের জের ধরে হামলার ঘটনা ঘটে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন হামলার মূল পরিকল্পনাকারী শাহরিয়ার, ভাসানটেক বস্তির মো. মামুন এবং মজুমদার মোড় এলাকার আসলাম ও মুন্না। পুলিশ জানায়, নিউ গিনি প্রপার্টিজের কাছ থেকে একটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে সেখানে স্টুডিও তৈরি করেছিলেন সালমান মুক্তাদির। শনিবার দিবাগত রাতে দুই ট্রাকে করে লোকজন এসে স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কঠোর হস্তে দমনের হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল রবিবার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সমসাময়িক বিষয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান।

মন্ত্রী বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। অপরাধী সে অপরাধীই। রাজধানীতে জাসদ কার্যালয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠক ও পুলিশি অভিযান প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে যে, ওই কার্যালয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কিছু সদস্য একত্রিত হয়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায় এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রাথমিক আটক করা প্রায় ২৮০ জনের মধ্যে বেশিরভাগকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ২৭ জনকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, উদ্ধার মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নিয়ে নাশকতায় জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও মামলা দায়ের করা হবে। কাউকে অযথা হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এই অভিযান চালানো হয়নি। কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর ও চাঁদা দাবির বিতর্ক নিয়ে মন্ত্রী জানান, বিরোধপূর্ণ জমিতে রাতের আঁধারে একপক্ষ দখল করতে গেলে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের একটি টিনশেড স্টুডিও ভাঙচুরের শিকার হয়। ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিন জনকে গ্রেপ্তার করে এবং গুলির খোসাসহ কিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে।

এ ঘটনায় ফেসবুক লাইভে এসে বিএনপিকে চাঁদাবাজ দল হিসেবে অভিযোগ উত্থাপন করা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভুক্তভোগী ব্যক্তি নিজেই স্বীকার করেছেন যে তার কাছে কেউ চাঁদা দাবি করেনি।  তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা ছাড়া ঢালাও অভিযোগের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ভুক্তভোগী লিখিত মামলা দায়ের করলে পুলিশ গুরুত্বের সাথে পুরো বিষয়টির সুনির্দিষ্ট তদন্ত সম্পন্ন করবে। মন্ত্রী বলেন, মিরপুরের শাহআলী থানা এলাকায় রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্ব অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। 

তিনি জানান, গত ২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে সংঘটিত ওই ঘটনায় শাহআলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হচ্ছে। 

তিনি আরো জানান, ঘটনাটি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য ডিএমপি কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ ইতোমধ্যে ৯ জন আসামিকে গ্রেপ্তারসহ বেশ কিছু মালামাল ও আলামত উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় জড়িত সব অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ডা. তাসনিম জারার প্রশ্ন : রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকার রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর লুটপাটের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ডা. তাসনিম জারা। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ৫০ বছর ধরে এলাকার মানুষের আস্থার প্রতীক এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ধ্বংস করে দেওয়া হলেও স্বাস্থ্যকর্মীরা খোলা আকাশের নিচে শিশুদের টিকাদানসহ জরুরি সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন।  গতকাল রবিবার দুপুরে স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি ধ্বংসস্তূপ সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। তাসনিম জারা বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি শুধু টিকাদান নয়, প্রসূতি মা, গর্ভবতী নারী ও এলাকাবাসীর নানা ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। ভবন ভেঙে দেওয়ার পরও মায়েরা রোদের মধ্যে কষ্ট করে শিশুদের টিকা দিতে নিয়ে আসছেন, যা এই কেন্দ্রের প্রতি মানুষের আস্থারই প্রতিফলন। তবে ডিএমপি কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর চললেও পুলিশকে জানানো সত্ত্বেও কেন তা ঠেকানো গেল না এবং এমন পরিস্থিতিতে মানুষ কীভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ভরসা করবে।

তিনি বলেন, এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশজুড়ে জমি, বাড়ি ও দোকান দখলের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে এবং অনেক অভিযোগ স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর কেন স্থানীয় পর্যায়ে দখলের এমন প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষয়ক্ষতির কথা তুলে ধরে তাসনিম জারা বলেন, ভাঙচুরে শিশুদের টিকাদানের রেজিস্টার খাতা, দুটি ট্যাব ও অফিসের ফোন হারিয়ে গেছে। আগে স্বাস্থ্যকর্মীরা রেজিস্টার দেখে অভিভাবকদের ফোন করে পরবর্তী টিকার সময় জানাতেন, এখন তারা নিজেদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সীমিতভাবে যোগাযোগ করছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, অনেক বাবা-মা টিকা কার্ড হারিয়ে ফেললে নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হতে পারে এবং এতে ভবিষ্যতে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়বে। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দ্রুত নতুন করে রেজিস্টার পুনর্গঠন ও প্রতিটি শিশুর টিকার তথ্য সংগ্রহে উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, আগে শিশুরা ছায়াযুক্ত কক্ষে বসে টিকা নিলেও এখন খোলা রোদের মধ্যে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, ফলে অনেক অভিভাবক ভিড়ের কারণে ফিরে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে গর্ভবতী নারীদের আল্ট্রাসনোগ্রাফি, নিয়মিত চেকআপ ও কাউন্সেলিংয়ের মতো সেবাও বন্ধ রয়েছে। আমি ভবনটি ঘুরে দেখেছি। ভবনের কিছু কক্ষ এখনো ব্যবহারযোগ্য, প্রশাসন দ্রুত সেগুলো খুলে দিলে অন্তত মাতৃস্বাস্থ্যসেবাগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।

তাসনিম জারা বলেন, সেবা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মপরিবেশও উন্নত করা জরুরি। বর্তমানে তারা ওয়াশরুম ব্যবহার ও খাবার খাওয়ার মতো ন্যূনতম সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। তাই ব্যবহারযোগ্য কক্ষ দ্রুত খুলে দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা পুনরায় চালু এবং অন্তর্বর্তী সময়ে টিকাদান ও অন্যান্য সেবা নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

টিআইবির উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ: রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লুটপাট, ভাঙচুর এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ঘটনাগুলোকে কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য অশনিসংকেত উল্লেখ করে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিসহ সারা দেশে দলের আত্মশুদ্ধি অভিযানের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল রবিবার টিআইবির এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘রাড্ডা এমসিএইচে লুটপাট, ভাঙচুর ও জবরদখল সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য বিব্রতকর দৃষ্টান্ত।’ টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বিবৃতিতে বলেন, ‘জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের একজন সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশের উপস্থিতিতে শত শত মানুষের সামনে অর্ধশত বছর ধরে গরিব-অসহায় মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ক্ষমতাসীন দল কোন ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে? রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্রের পতনের প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক নির্বাচনের জনরায়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের নেতাকর্মীদের এজাতীয় কর্মকাণ্ড দেশবাসীর কাছে কী বার্তা দিচ্ছে? সাধারণ জনগণের মানসপটে বিগত সময়ের কর্তৃত্ববাদী সরকারের স্বেচ্ছাচারী আচরণ এখনো সতেজ। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা দলীয় নেতা-কর্মীদের উল্লেখযোগ্য অংশের চলমান দখলবাজি ও চাঁদাবাজির পরিণতি ভেবে দেখছেন কি?’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর বিএনপির একাংশের বিরুদ্ধে দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, বাজার, জলমহাল, বালুমহাল, হাটবাজার, কেব্‌ল, ইন্টারনেট ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে এসব কর্মকাণ্ড চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এসব নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে, যা সরকারের জন্য অশনিসংকেত।

কিশোরগঞ্জের জলমহাল দখল নিয়ে স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও ক্রিয়েটিভ স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; ২০২৪ সালের আগস্টের পরের ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতা। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার এখনই কার্যকর আত্মশুদ্ধিমূলক পদক্ষেপ না নিলে দখলবাজি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, দলীয়ভাবে বহিষ্কারসহ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কঠোর প্রতিরোধের ঘাটতি এবং ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এতে স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানায় টিআইবি।

অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুলের আহবান:  কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও এবং মিরপুরের রাড্ডা টিকাকেন্দ্রে সেন্টারে হামলা-লুটপাটের ঘটনাকে সরকারের জন্য ‘স্পষ্ট ওয়েক-আপ কল’ বলে মনে করেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। এসব ঘটনায় জড়িত সবাইকে, এমনকি নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গতকাল রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ নজরুল এসব কথা বলেন। অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে এবং মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও লুটপাট গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু এগুলো শুধু অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।’

এ ধরনের ‘বেপরোয়া কর্মকাণ্ড’ রাষ্ট্রের আইন ও কর্তৃত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জের মতো কিছু বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এ অধ্যাপক। সরকারকে এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে গ্রেপ্তারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধু মাঠের ফুট সোলজারদের না, নেপথ্যে যারা আছে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।’ অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থতার পেছনে বাস্তব কিছু সীমাবদ্ধতা বা যুক্তি থাকতে পারে উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেন, ‘কিন্তু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীকে শনাক্ত, গ্রেফতার এবং বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কোনো অজুহাত থাকতে পারে না।’ সরকারকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এসব গুরুতর অপরাধ সরকারের জন্য স্পষ্ট ওয়েক-আপ কল। অপরাধী যে দলের হোক না কেন, সরকারকে কঠোর হতে হবে। এখনি।’

মবতন্ত্রের’ অভিযোগ আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার: ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় হামলা ও ভাঙচুরের উল্লেখ করে মবতন্ত্র কায়েম করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। গতকাল রবিবার মিরপুর ১-এ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার পরিদর্শন শেষে তিনি এ কথা বলেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। পরে সেটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। গুঁড়িয়ে দেওয়া ওই কেন্দ্রে আসিফ মাহমুদের বক্তব্যের পর সেখানে টাঙানো ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিঃ’ নামের একটি বিলবোর্ড ফেলে দেওয়া হয়। আসিফ মাহমুদ বলেন, সংবাদপত্রের মাধ্যমে তাঁরা রাড্ডা সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর জানতে পারেন। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, ওষুধ ও চিকিৎসার বিভিন্ন সরঞ্জাম লুট করে নেওয়া হয়েছে। এমনকি দরিদ্র শিশুদের জন্য রাখা টিকাও লুট করা হয়েছে। দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবার জায়গায় এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জার। এনসিপির এই মুখপাত্র বলেন, শুধু এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নয়, একই এলাকায় আরও দুটি জায়গায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে একটি স্টুডিওতে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। দুই দিনের মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা ঘটায় এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।