আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের মার্কেট এখন বাংলাদেশ

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১২:৪১ পূর্বাহ্ন, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৪:৫০ পূর্বাহ্ন, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

মরণ নেশা ইয়াবা ফেনসিডিল ও কোকেনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভয়ংকর সব মাদক দ্রব্য পাচারের ক্রমবর্ধমান হাবে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ। অভিযোগ আছে বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের সহায়তায় ইয়াবা ফেনসিডিলের মতো মাদক বাংলাদেশের চারদিক থেকেই বানের পানির মতো ঢুকছে। বৈধ বারের চেয়ে দেশে অবৈধ বারের সংখ্যাই বেশি। এসব বারে বিষাক্ত মাদকদ্রব্যের ছড়াছড়িতে ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্ম আসক্ত হয়ে কর্মহীন হয়ে পড়ছে। সমাজ সংসারে অশান্তি ও কলহ বাড়ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক এখনও গাঁজা। 

এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মেথামফেটামিন বা ইয়াবা। তবে বাংলাদেশ কোনো মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হওয়া সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য হারে হারে বেড়েছে ক্রিস্টাল মেথ এবং কোকেনের ব্যবহার। ইয়াবার বাইরে নতুন আতঙ্ক এখন ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, এলএসডি, ডিএমটি, কুশ এবং বিভিন্ন ধরনের সিন্থেটিক বা ডিজাইনার ড্রাগ। মাদকদ্রব্য নিয়য়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, বাংলাদেশে মাদকের চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক উভয় প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি অপ্রচলিত বিভিন্ন মাদকের প্রবেশ ও ভোক্তা তৈরি। ২০১৮-২০২৫ সাল পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ১৩টি অপ্রচলিত মাদক। এগুলো হলো- খাত, আইস, এমডিএমএ, এলএসডি, টাপেন্টটাডল, ট্রামাডল, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম, ডিওবি, কুশ, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জমাট হিরোইন, ব্ল‍্যাক কোকেন ও এমডিএমবি। সিন্থেটিক ড্রাগ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল নারকোটিক্স কন্ট্রোল বোর্ডের (আইএনসিবি) ২০২৫ সালের প্রতিবেদন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৫-এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে দেশে মোট মাদকাশক্তের সংখ্যা ৯ লাখ। বেসরকারি প্রতিবেদনে দেখা যায় ১ কোটিরও বেশি লোক মাদকাসক্ত।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে একমত বিশ্বব্যাংক

দুটি প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বৈশ্বিক মাদকবাজারের পরিবর্তনের ঢেউ বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের মাদক বিস্তারে হয়েছে। এখন শুধু পাচারের ট্রানজিট রুট প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই হচ্ছে না, আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটগুলোর ক্রমবর্ধমান ড্রাগ মার্কেটে পরিণত করার চেষ্টা হচ্ছে। এরমধ্যে অন্যতম কোকেন ও সিন্থেটিক ড্রাগ। সিন্থেটিক ড্রাগ বা নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেন্স হলো সাধারণত সিন্থেটিক বা রাসায়নিকভাবে তৈরি মাদক যা হেরোইন, কোকেন, গাঁজা বা একস্ট্যাসির মতো প্রচলিত অবৈধ মাদকের প্রভাব নকল করার জন্য তৈরি করা হয়। রাসায়নিক গঠন পরিবর্তন করে ল্যাবরেটরিতে এসব তৈরি করা হয়। এগুলোকে প্রায়ই 'লিগ্যাল হাই', 'বাথ সল্ট' বা 'রিসার্চ কেমিক্যাল' হিসেবে বাজারজাত করা হয়। কোকেন পাচারে বাংলাদেশকে রুট প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা বলছেন, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের দুটি প্রধান মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চল-গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওস) এবং গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইরান) এর মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। এই কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ একই সঙ্গে মাদক পাচারের ট্রানজিট ও গন্তব্যস্থলে হিসেবে টার্গেট স্পট। স্থল, জল ও আকাশপথ- তিন পথেই মাদক দেশে প্রবেশ করছে। আইএনসিবির মূল্যায়ন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়া এখন আর শুধু ট্রানজিট রুট নয়, বরং কোকেনের একটি ক্রমবর্ধমান গন্তব্য অঞ্চল হিসেবেও আবির্ভূত হচ্ছে। বিশ্ববাজারে কোকেনের অতিরিক্ত সরবরাহ, পাচারের রুটের পরিবর্তন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা ও অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশে কোকেনের প্রবেশ ও ব্যবহার বাড়ছে। ইয়াবাসহ প্রায় সব মাদকই আসে মিয়ানমার-ভারত থেকে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, বর্তমানে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের প্রধান উৎস মিয়ানমার। মিয়ানমারের শান ও কাচিন রাজ্যের গোপন ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত মাদক নাফ নদী হয়ে টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন, উখিয়া ও কক্সবাজার উপকূল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

অন্যদিকে আইএনসিবি বলছে, মিয়ানমার থেকে মেথামফেটামিন প্রথমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পাচার হয়। পরে সেই মাদক ভারতের বিভিন্ন সীমান্তপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে আসে। মিয়ানমার-ভারত-বাংলাদেশ করিডর এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সক্রিয় মাদক রুটে পরিণত হয়েছে। হেরোইন মূলত ভারত থেকে বাংলাদেশের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে বাংলাদেশের রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হয়ে হেরোইন পাচার করা হয়। গাঁজা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্ব সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট এবং দিনাজপুর সীমান্ত এলাকাগুলো গাঁজা পাচারের জন্য ব্যবহৃত হয়। ফেনসিডিল (কোডিন-ভিত্তিক সিরাপ) ভারত সীমান্ত সংলগ্ন জেলা যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর এবং কুড়িগ্রামের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে এটি বাংলাদেশে আসে। ট্যাপেন্টাডল ভারতের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, লালমনিরহাট এবং দিনাজপুর জেলা দিয়ে এটি পাচার হয়।

আরও পড়ুন: রিফাইন্ড থেকে নতুন করে রিকনসিলিয়েশন

নতুন আতঙ্ক সিন্থেটিক ড্রাগ: প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি বাংলাদেশে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্সেস (এনপিএস) সিন্থেটিক বা ডিজাইনার ড্রাগ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েডস, ক্যাতিনোনস, ট্রিপটামাইনস এবং ফেনইথিলামাইনস। এসব মাদক ব্যবহারকারীদের তীব্র বিষক্রিয়া, খিঁচুনি, সাইকোসিস এবং মারাত্মক মানসিক জটিলতায় ফেলতে পারে।

ইয়াবার বিকল্প টাপেন্টাডল: চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওপিওড ব্যথানাশক টাপেন্টাডল এখন মাদকসেবীদের নতুন পছন্দে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়াবা বা অ্যামফেটামিনজাতীয় মাদকের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু ২০২৪ সালেই প্রায় ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৩৬৪টি টাপেন্টাডল ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে।

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফ ও কক্সবাজারের পাশাপাশি এখন বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র এলাকা এবং পটুয়াখালীর উপকূলকে বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। মাদক পাচার শনাক্ত ও প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগত সহায়তাও দিচ্ছে। মামলা-আসামী বাড়লেও মাদক বেড়েছে আরো কয়েক গুণ। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মামলা হয়েছে। ২০২০ সালে মামলার সংখ্যা ১৭ হাজার ৩০৪, আসামী ১৮ হাজার ৩২১। ২০২১ সালে মামলা ২০ হাজার ৫৯২, আসামী ২১ হাজার ৯৯২। ২০২২ সালে মামলা ২৫ হাজার ৬৫৪, আসামী ২৭ হাজার ৯৫৯। ২০২৩ সালে মামলা ২৭ হাজার ৯৯১, আসামী ২৯ হাজার ৭৭৩। ২০২৪ সালে মামলা ২১ হাজার ৯১৩, আসামী ২৩ হাজার ৩৮৬। ২০২৫ সালে জানুয়ারি-এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে মামলা ১০ হাজার ১৩৪, আসামী ১০ হাজার ৬৮৯ বর্তমান সরকার ক্ষমতা আসার পর মাদক ও জুয়াতে অপরাধের মূল কেন্দ্রবিন্দ হিসেবে চিহ্নিত করে আইন পরিবর্তন করে দেশব্যাপী অভিধান চালালেও অবৈশ মাদক বিস্তার রোধ করা যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায় ঢাকা শহরে প্রতিদিন ১০৫০৫ লাখের বেশি ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়- রাজধানী-সঙ্গ সর্বত্রই ইয়াবার চাহিদা উদ্বেগ জনক। স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী থেকে সরকানি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও ইয়াবা আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। টিনেজ বয়স থেকেই বন্ধুদের খপ্পরে পড়ে ইয়াবার শুরু। তারপর থেকে শুরু হয় পরিবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভয়ংকর প্রভাব। রাজধানী থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকাতেও পৌঁছে গেছে ইয়াবার বিষাক্ত ছোবল। এই মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে সরকারি অভিযান আন্তরিক হলেও মাঠ পর্যায়ে তেমন সারা ফেলেনি। সরকারি অভিযানের মাঝেও প্রতিদিন বানের পানির মতোই চারদিক থেকে মাদক ঢুকছে। জাতীয় সংসদে কয়েকজন সংসদ সদস্য পানীয় সেবীদের জন্য বিয়ার ও হাইজেনিক মাদকের ফ্রি সরবরাহ দাবি করেছে। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মিটিংয়েও এরকম দানি উঠেছে। বাস্তবে দেখা যায় সারাদেশে ১৭৬টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মোট বারে সংখ্য বার লাইসেন্স ২৪২টি (হোটেল বার- ১২৭টি, রেষ্টুরেন্ট বার-৬৩টি, ক্লান বার- ৪৮টি, রিসোর্ট বার-০৪)। এগুলোতেও পানীয় সেবন নিরাপদ নয় সরকারিভাবে লাইসেন্স নিয়ে ভ্যাট ট্যাক্স পরিশোধ করে ব্যবসা পরিচালন করলেও সেখানেও হয়রানীর স্বীকার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মিয়ানমার ২০০৫ সালের দিকে ইয়াবা পাচারের সূচন করে। ২০০৬ সালে প্রথম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ইয়াবার চালান ধরা পড়ে সেই থেকে ক্রমান্বয়ে ইয়াবার প্রকোপ বেড়ে চলেছে। এত বছরে মিয়ানমার। ইয়াবার কারখানা বাড়িয়েছে বহু গুণ। বাংলাদেশকে টার্গেট করে কক্সবাজারে উখিয়াটেকনাফ এবং বান্দরবানের সীমান্ত কেন্দ্রিক দেড় শতাধিক ইয়াবা কারখানা গড়ে তুলেছে মিয়ানমার। উৎপাদিত ইয়াবার ৯০ শতাংশই পাচার করছে বাংলাদেশে। বর্তমানে বাংলাদেশে ইয়াবার ভয়ংকর আগ্রাসন চলছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে শুধু ইয়াবার বার্ষিক অভ্যন্তরীন ব্যবসার পরিমাণ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। কোনো কোনো বছর তা আরও ছাড়িয়ে যায়। এই বিশাল অঙ্কের কালো টাকা দেশের মূল অর্থনীতিকে গ্রাস করছে এবং এর মাধ্যমে গড়ে উঠছে অবৈধ অস্ত্রের সিন্ডিকেট, হুন্ডি ব্যবসা ও রাজনৈতিক অর্থায়ন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সৌমেন মন্ডল জানান, ইয়াবার ওই দাম বর্তমানেও এই হারে আছে।

প্রশ্ন উঠেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে। গোয়েন্দা সক্ষমতা এব পর্যাপ্ত জনবলের অভাবের অজুহাতে সংস্থাটি মূলত খুচরা বিক্রেতা বা চুনোপুঁটিদেন ধরেই তাদের দায়িত্ব শেষ করে। বছরের পর বছর ধরে টেকনাফ ও কক্সবাজারেন শীর্ষ ইয়াবা গডফাদারদের তালিকা তৈরি করা হলেও, সেই তালিকা কেবল ফাইলের ভেতরেই বন্দি রয়েছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা মূল হোতাদের স্পর্শ করার সাহস বা সদিচ্ছা কোনোটিই এই অধিদপ্তর দেখাতে পারেনি।

অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন, টহল পুলিশ এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের একাংশ এই সিন্ডিকেটের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা বক 'রয়‍্যালটি' পেয়ে থাকে। চোরাকারবারিরা কখন কোন রুট ব্যবহার করবে, তাল আগাম তথ্য পাওয়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়। এই পরোক্ষ সহযোগিতা ও 'নিয়ন্ত্রিত নীরবতা'র কারণেই বছরের পর বছর ধরে হাজার কোটি টাকার মাদকবিরোধী অভিযান বা 'বন্দুকযুদ্ধ'র নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পরও ইয়াবা প্রবাহ এক বিন্দুও কমানো সম্ভব হয়নি।

শেষ গন্তব্য যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইয়াবার থাবা আজ আর শুধু সীমান্ত বা বস্তিতে সীমাবদ্ধ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবারের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই মরণনেশার প্রধান শিকারে পরিণত হচ্ছে। ইয়াবার মূল উপাদান মেথঅ্যামফিটামিন মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দেয়। ফলে ইয়াবা আসক্ত তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতার মতো মারাত্মক অপরাধে। মনোবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, ইয়াবা সেবনের ফলে মস্তিষ্কে ডোপামিনের যে কৃত্রিম বন্যা বয়ে যায়, তা মানুষের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি কেড়ে নেয়। এর ফলে আসক্ত ব্যক্তি চরম মাত্রায় সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে। সে তখন নিজের বাবা, মা বা স্ত্রীকেও শত্রু মনে করে এবং তাদের ওপর চড়াও হয়। মাদকাসক্তদের শুধু পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে ভালো করা যাবে না, তাদের সুচিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক কাউন্সেলিং প্রয়োজন।

সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, মাদক যখন কোনো সমাজে মহামারি আকার ধারণ করে, তখন সেই সমাজের নৈতিক এবং পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। ইয়াবার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সন্তান যখন মা-বাবাকে খুন করে, তখন বুঝতে হবে সমাজ কতটা পচে গেছে। রাষ্ট্র যদি মাদকের গডফাদারদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করে, তবে শুধু চুনোপুঁটি ধরে এই সামাজিক অবক্ষয় ঠেকানো সম্ভব নয়। একইসঙ্গে মাদক প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদিত বারে যেভাবে অভিযান চালাতে দেখা যায়, ইয়াবার মতো অবৈধ ও নিষিদ্ধ মাদকের বিরুদ্ধে সেভাবে অভিযান চোখে পড়ে না। সরকারকে এ বিষয়ে নজর বাড়াতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সৌমেন মন্ডল বলেন, মাদকের চালান জব্দ হওয়া ঘটনা বেড়েছে। চালান বেশি ধরার পড়ায় পাচার বেড়েছে বলা হলেও এটা আবার উল্টো হতে পারে। ইয়াবাসহ সমস্ত মাদক রোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা এখন একযোগে কাজ করছে। সেই সাথে সম্প্রতি টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে। সব মিলে মাদকের বিরদ্ধে অ্যাকশন বেড়েছে বহু গুণ।