৮ নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে, উত্তর-পূর্বে বন্যার শঙ্কা
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে হাওরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় দেখা দিয়েছে বন্যার আশঙ্কা। এর প্রভাবে হাওর বেসিনের তিন জেলার ৮টি নদীর আটটি স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। গতকাল সোমবার এমন পূর্বাভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে আবাদ হওয়া বোরো ধানের অর্ধেকের বেশি এখনো কাটার বাকি। এখনো প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান হাওরে রয়ে গেছে। এর মধ্যে অনেক ধান এখনো পুরোপুরি পাকেনি। নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলেও একই অবস্থা; সেখানে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৮ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
আরও পড়ুন: ৮ অঞ্চলে দুপুরের মধ্যে ঝড়বৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত
তবে স্থানীয় কৃষকরা জানান, কৃষকরা এখন দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন। অনেক নিচু জমিতে পানি জমে থাকায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার চালানো যাচ্ছে না। আবার শ্রমিকের প্রচণ্ড সংকট ও বাড়তি মজুরির কারণে কৃষকরা দিশেহারা। সুনামগঞ্জে জনপ্রতি শ্রমিকের মজুরি ১২০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বন্যার হাত থেকে বাঁচতে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান কেটে ফেলছেন। কিন্তু বিরূপ আবহাওয়ার কারণে সেই ধান মাড়াই করা বা রোদে শুকানো সম্ভব হচ্ছে না। ধান শুকাতে না পারলে তা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এছাড়া প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে ধান ঘরে তুললেও বাজারে প্রত্যাশিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের বর্তমান বাজারমূল্য অনেক কম হওয়ায় তারা লোকসানের শঙ্কায় আছেন।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন কৃষকদের ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলেই তা দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ধান কাটার যন্ত্রের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের উপজেলা প্রশাসনগুলো মাইকিং করে কৃষকদের সতর্ক করছে।
আরও পড়ুন: ঢাকাসহ ১৩ জেলায় দুপুরের মধ্যে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের পূর্বাভাস
পাউবো বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, নেত্রকোনার জারিয়াজঞ্জাইলে ৭৪ মিলিমিটার, হবিগঞ্জ সদরে ৭৪ মিলিমিটার এবং চাঁদপুর-বাগানে ৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুরে নলজুর নদীর পানি ১১ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নেত্রকোনা জেলার জারিয়াজঞ্জাইলে ধনু-বাউলাই নদীর পানি ৯ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই জেলার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানি ১৪ সেন্টিমিটার কমলেও এখনো বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর রয়েছে। এছাড়া জারিয়াজঞ্জাইলে ভুগাই-কংশ নদীর পানি ২২ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৬৭ সেন্টিমিটার ওপর রয়েছে। নেত্রকোনা সদরে মগরা নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৭৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং আটপাড়ায় একই নদীর পানি বিপৎসীমার ২৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জে কালনি নদীর পানি ১৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই জেলার সুতাং রেলসেতু এলাকায় সুতাং নদীর পানি ২৩ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৮৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে হবিগঞ্জ জেলার কালনি নদীর পানি ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ১০ সেন্টিমিটার ওপর (আজমিরীগঞ্জ), সুতাং নদীর পানি ২৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ৮৩ সেন্টিমিটার ওপর (সুতাং রেল-ব্রিজ), সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে নদীগুলোর পানির সমতল ঘণ্টায় ০ থেকে ১ সেন্টিমিটার হারে অত্যন্ত ধীরগতিতে বাড়ছে। তবে ভারতের বিশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, মেঘালয় ও আসামে মাঝারি থেকে মাঝারি-ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সাড়ে ৭ হাজার টাকা দেওয়া হবে: দেশের হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা শুরুতে সাড়ে সাত হাজার করে টাকা পাবেন। তাদের তিন মাসব্যাপী সহায়তা দেবে সরকার। ক্ষতির বিবেচনায় এ সহায়তা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ। গতকাল সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে তৃতীয় অধিবেশন শেষে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এ কথা জানান কৃষিমন্ত্রী। এর আগে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ডিসিদের অধিবেশন হয়।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ বলেন, হাওর এলাকায় যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল, অন্যান্য তহবিল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল থেকে অর্থ সহায়তা দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। এখন যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে দেওয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। আগামী তিন মাস তাদের সহায়তা দেওয়া হবে। শুরুতে আমরা সাড়ে সাত হাজার টাকা করে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দেব। এর জন্য একটি কমিটি করা হচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ে তালিকা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই। অনেক সময় ভালো ফলনের পরও অতিবৃষ্টি বা বন্যায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ অবস্থায় খাদ্যাভ্যাসে আলুর ব্যবহার আরও বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের অকাল বন্যায় হাওরের ফসল পুরোপুরি তলিয়ে যাওয়ায় সারাদেশে চালের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। এবারও জাতীয় খাদ্যভাণ্ডারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই অঞ্চলের ধান রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।





