অস্থির হচ্ছে পাহাড়: বাড়ছে টার্গেট কিলিং, আতঙ্কে জনপদ

Sanchoy Biswas
আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: ৯:০২ অপরাহ্ন, ২১ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১১:৩৭ অপরাহ্ন, ২১ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা- রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান- জুড়ে চলমান সহিংসতার ধারার মধ্যেই এবার নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে টেকনাফ-এর পাহাড়ি এলাকার সাম্প্রতিক ঘটনা। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড় থেকে মঙ্গলবার সকালে তিন যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতরা একই এলাকার বাসিন্দা বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা, আধিপত্য বিস্তার বা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।

এর আগে রাঙামাটির কুতুকছড়ি এলাকায় ভোরে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট- সংযুক্ত এক নেতাকে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় এবং গুলিতে আহত হন আরও দুই নারী। সাম্প্রতিক এই দুই ঘটনাসহ গত কয়েক মাসে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, অপহরণ ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

আরও পড়ুন: শরীয়তপুরে পুরোনো কবর থেকে ভ্যানচালকের মরদেহ উদ্ধার

স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পাহাড়ে সহিংসতার পেছনে মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজন। বিশেষ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি-এর বিভিন্ন অংশ ও উপদলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব মাঝেমধ্যেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে।

নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, গত কয়েক বছরে পার্বত্য অঞ্চলে সহিংসতার প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে যেখানে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন, সেখানে ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৪০ জনে। ২০২৩ সালে নিহতের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে যায় এবং ২০২৪ সালে তা ৬০-এর বেশি হয়। ২০২৫ সালে প্রাণহানি প্রায় ৭০ জনের কাছাকাছি পৌঁছায়। চলতি বছর ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শৌচাগার সংকট, প্রতিমন্ত্রীর কাছে আবেদন কবীর আহমেদ ভূঞার

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়- অপহরণ, নির্যাতন, জোরপূর্বক চাঁদা আদায় এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে স্বল্প সময়ের মধ্যে শতাধিক সহিংস ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে কয়েকশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে অভিযোগ জানাতে সাহস পান না।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। পুরোনো ভিডিও কিংবা অন্য দেশের সহিংসতার ছবি বর্তমান পাহাড়ি পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হচ্ছে, যা জনমনে আতঙ্ক বাড়ানোর পাশাপাশি উত্তেজনা ছড়িয়ে দিচ্ছে। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের গুজব নিয়ন্ত্রণে না আনলে বাস্তব পরিস্থিতির চেয়েও বড় সংকট তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অস্থিরতা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; বরং এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জাতিগত জটিলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ, আঞ্চলিক চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে অসন্তোষ, বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থের সংঘাত এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ১৯৯৭ সালের চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল শান্তি চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়াকেও অনেকে এই অস্থিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

সব মিলিয়ে, টেকনাফ থেকে রাঙামাটি- পুরো পাহাড়ি অঞ্চলজুড়ে যে সহিংসতার ধারা আবার দৃশ্যমান হচ্ছে, তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বরং এটি একটি বিস্তৃত অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা জোর দিচ্ছেন নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের ওপর।