ফিডের চড়া দামে খামার বন্ধ করছেন নরসিংদীর পোল্ট্রি খামারিরা
নরসিংদীর শিবপুরের বাঘাব ইউনিয়নের ছোট্ট একটি গ্রাম আক্রাশাল। ভোরের আলো ফুটতেই কয়েক হাজার মুরগির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠত মাহবুবের পোল্ট্রি খামারগুলো। কিন্তু হঠাৎই বদলে গেছে পরিস্থিতি। সেই খামারগুলো এখন নিস্তব্ধ। আগের মতো নেই সেই কোলাহল। একসময় খামারি মাহবুবের খামারে প্রতিদিন ৫ হাজার ডিম উৎপাদিত হতো। তবে ক্রমাগত লোকসানের মুখে তিনি একটি বাদে বাকি খামারগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রায় ১৪/১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে পোল্ট্রি মুরগির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এই ব্যবসায়ী আজ ফিডের চড়া (মুরগির খাদ্য) দামের কারণে খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। শুধু তিনি নন, তার মতো আরও অনেকে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত; তারাও বন্ধ করে দিচ্ছেন খামার।
শিবপুর ও রায়পুরার একাধিক খামারির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পোল্ট্রি খামারিরা বর্তমানে লাগামহীন উৎপাদন খরচ এবং তুলনামূলক কম বাজারদরের দ্বিমুখী চাপে দিশেহারা। ফিডের চড়া মূল্য এবং মুরগির বাচ্চার লাগামহীন দামের কারণে প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিরা আজ চরম লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। বর্তমানে পোল্ট্রি খাদ্যের দাম বিগত কয়েক বছরের তুলনায় শতকরা ৪০ থেকে ৫০ ভাগ পর্যন্ত বেড়েছে। উৎপাদন খরচের প্রায় ৮০ শতাংশই চলে যায় মুরগির খাবারের পেছনে। ফলে একটি ডিম উৎপাদনে প্রায় ৯ থেকে সাড়ে ৯ টাকা খরচ হলেও পাইকারি বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৭ টাকা থেকে সাড়ে ৮ টাকায়। ব্রয়লারসহ অন্যান্য মুরগির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। যার ফলে খামারিরা উৎপাদন খরচের টাকাই তুলতে পারছেন না। এতে করে লোকসান ও ঋণের চাপে দিশেহারা হয়ে ইতোমধ্যে অনেক খামারি তাদের খামার বন্ধ করে দিয়েছেন।
আরও পড়ুন: জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বন বিভাগের অভিযান, অপসারণ ১৬ অবৈধ বাঁধ
আক্রাশালের খামারি মাহবুব বলেন, ব্যবসায় এখন লাভ তো দূরের কথা, টিকে থাকাটাই দুরূহ হয়ে পড়েছে। একটি ডিম উৎপাদনে আমার খরচ হয় প্রায় সাড়ে ৮ টাকা থেকে ৯ টাকা। কিন্তু বর্তমানে পাইকারি বাজারে ৮ টাকা থেকে সাড়ে ৮ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। মাসের পর মাস লোকসান দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। কিছুদিন পূর্বেও আমার খামারে ৫ হাজার ডিম উৎপাদন হতো। আর এখন মাত্র ১ হাজার ডিম উৎপাদন করি। কোনোভাবেই আর পারছি না। তিনি আরও বলেন, শুধু আমি নই, আমার চারপাশের অনেকেই ইতোমধ্যে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। পরিস্থিতি এমন থাকলে এই শিল্পটাই একদিন বন্ধ হয়ে যাবে।
আরেক খামারি বলেন, ডিমের বাজার আজ এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে অনেক খামারি উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না। খাদ্য, ওষুধ, শ্রমিক ও বিদ্যুতের খরচ প্রতিনিয়ত বাড়ছে, কিন্তু ডিমের ন্যায্য দাম মিলছে না। এর ফলে ছোট ও মাঝারি খামারিরা চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তিনি আরও বলেন, খামারি বাঁচলে ডিম উৎপাদন বাড়বে। আর ডিম উৎপাদন বাড়লে সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে পুষ্টিকর খাবার পাবে। তাই ডিমের মূল্য ন্যায্য রাখার পাশাপাশি খামারিদের জন্য ফিডের দাম সাশ্রয়ী করা এখন সময়ের দাবি।
আরও পড়ুন: পাহাড়ে সবুজায়ন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করেছে সেনাবাহিনী
মরজালের হালিমা আক্তারও শোনালেন একই ধরনের কথা। তিনি বলেন, ফিডের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে, কিন্তু মুরগির দাম সেভাবে বাড়েনি। অনেক সময় আমরা উৎপাদন খরচও তুলতে পারি না। এভাবে চলতে থাকলে আমার মতো ক্ষুদ্র খামারিরা শেষ হয়ে যাবে। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতে এই ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এখন লাভ তো দূরের কথা, সংসারের খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। দিনদিন ফিডের দাম বাড়ছে। কিন্তু বাড়েনি মুরগির দাম। উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের জাঁতাকলে আমাদের মতো ক্ষুদ্র খামারিরা পিষ্ট হয়ে যাচ্ছেন। গত ৫ বছরে ফিডের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে বিভিন্ন জাতের ফিডের বস্তা প্রতি ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় পৌঁছেছে। এর বিপরীতে প্রতি কেজি ব্রয়লারের পাইকারি দাম ১২০ টাকা থেকে ১২৫ টাকা।
অপর এক খামারি বলেন, শুধু ফিডই নয়, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ওষুধের দাম। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং সাধারণ মানুষের আমিষের চাহিদা মেটানোর জন্য সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অবিলম্বে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিম ও মাংসের দাম নির্ধারণ করা না হলে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে পুরো পোল্ট্রি শিল্প।





