আজ সিরাজুল আলম খানের জন্ম দিন
৬ জানুয়ারি ছিল সিরাজুল আল খানের জন্ম দিন। বেঁচে থাকলে তাঁর বয়েস হোত ৮৫ বছর।
সিরাজুল আলম খান—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অব্যক্ত নাম, এক নীরব বিপ্লবী, যিনি কখনো মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দেননি, কখনো পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রচিন্তা ব্যাখ্যা করেননি, অথচ একাত্তরের স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁকে অনেকেই চেনেন “নিউক্লিয়াস”-এর স্থপতি, কেউ বলেন “গণবাহিনী”-র সংগঠক, কেউ বলেন “জাসদের জনক”—কিন্তু এসব নামের আড়ালে যে একটি দীর্ঘ, গম্ভীর এবং অন্তর্মুখী জীবন রয়ে গেছে, যার চালিকাশক্তি ছিলএকটি উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশে একটি নতুন জনগোষ্ঠি ও নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন। তাকে যথার্থভাবে আজও বোঝার চেষ্টা হয়। দুই হাজার চব্বিশের জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পরে আমরা নতুন ভাবে ইতিহাস পাঠের প্রেরণ পেয়েছি। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর সিরাজুল আলম খানের জীবনের শুরু থেকে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার উৎস, তাঁর নিভৃত সংগঠনের পদ্ধতি, এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে তাঁর ভূমিকার পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা একটি জরু রাজনৈতিক কর্তব্য হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: একজন শরিফ ওসমান হাদি: আজ লক্ষ হাদিতে রূপান্তর
সিরাজুল আলম খান ১৯৪১ সালে, বৃটিশ ভারতের অন্তর্গত বাংলাদেশের এক রাজনৈতিক পরিবারে হন্মগ্রহণ করেন। । তাঁর শিক্ষাজীবন কেটেছে ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তরুণ বয়সেই তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোগত বৈষম্য এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর পাকিস্তানী দমননীতি বুঝতে শুরু করেন। এই বোধ থেকেই রাজনীতির সঙ্গে তাঁর প্রথম মোলাকাত। কিন্তু তিনি নিজেকে কখনো বক্তৃতাদানকারী জননেতা হিসেবে গড়ে তোলেননি। বরং তিনি চিন্তা করতেন ভিতর থেকে, সংগঠন গড়তেন ছায়ায়, এবং ভবিষ্যতের জন্য রাজনৈতিক রূপরেখা রচনা করতেন গভীর ধ্যানমগ্নতায়। তাঁর এই নিভৃতচারী বৈশোষ্ট্যের কারণে অনেক অল্প বোধ ও স্বল্প বুদ্ধির মানুষের কাছে ‘রহস্যময়’ পুরুষ হিশাবে গণ্য হয়েছেন।
১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময় থেকেই পূর্ব বাংলায় বা তৎকালীন পূর্ব পাকিতানে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তীব্র হয়ে ওঠে। শেখ মুজিবুর রহমান তখন আওয়ামী লীগের সংগঠক। অন্যদিকে সিরাজুল আলম খান "ছাত্রলীগ" ও অন্যান্য গণসংগঠনের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার শক্তি গড়ে তুলছিলেন। এই পটভূমিতে সিরাজুল আলম খান ভাবতে শুরু করেন—একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র যদি কখনো গঠিত হয়, তবে তা কেবল পাকিস্তান থেকে মুক্ত হওয়া নয়, বরং একটি “গণভিত্তিক, সংগঠিত, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র” হবে কিনা—এই প্রশ্নটিই মুখ্য। তাঁর দৃষ্টিতে রাজনৈতিক মুক্তি মানে শুধু স্বাধীন পতাকা, মানচিত্র বা জাতীয় সংগীত ছিল না; বরং রাজনৈতিক মুক্তি মানে গণমানুষের চেতনাগত মুক্তি, আত্মগঠনের সক্ষমতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার অধিকার।
আরও পড়ুন: নির্মল সেন: এক নির্মোহ বিপ্লবীর মহাকাব্য ও গণমানুষের দণ্ডায়মান বিবেক
এই সময় থেকেই তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, স্বাধীনতার আন্দোলন কেবল প্রকাশ্য রাজনীতির মধ্য দিয়ে সম্ভব নয়; এর জন্য চাই ছায়ার মতো সংগঠিত এক জনগোষ্ঠী, যাদের হাতে ভবিষ্যতের রাষ্ট্র নির্মিত হবে। এই চিন্তা থেকেই তিনি গঠন করেন গোপন বিপ্লবী সংগঠন "নিউক্লিয়াস"। নিউক্লিয়াসের তিনটি মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল:
১. পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা
২. একটি গণমুখী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর রূপরেখা তৈরি করা
৩. সংগঠিত জনগণের হাতে রাষ্ট্রের গঠনতান্ত্রিক ক্ষমতা সোপর্দ করা
এই চিন্তা একাধারে মার্কসবাদ, জাতীয়তাবাদ এবং উপনিবেশবিরোধী বিপ্লবের মিশ্রপন্থার মধ্যে একটি নতুন তত্ত্বের ইঙ্গিত করছিল। কিন্তু তা কোন ইউরোপীয় আদর্শের হুবহু অনুকরণ নয়—বরং স্থানীয় বাস্তবতা, গণমানুষের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশী চেতনা কেন্দ্র করেই তার মৌলিকতা খান অন্বেষণের চেষ্টা করেছিলেন। এ কারণেই সিরাজুল আলম খান ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র’ ধারণার একজন প্রথম সারির চিন্তানায়ক হিশাবে হাজির হন। তাঁর চিন্তা ও গণসাংগঠনিক অভিজ্ঞতা শুধু ঐতিহাসিক উপাদান বা স্মৃতি মাত্র নয়, বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন ভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের কেন্দ্রীয় বিষয় হিশাবে হাজির হয়েছে।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হো্লো তিনি নিজেকে কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের মুখ্য নেতা হিসেবে দাবি করেননি। এমনকি জাতীয় সমাজ তান্ত্রিক দলও না। জাসগ জন্ম নেবার তিই অনুঘটল ছিলেন, কিন্তু কখনই নিজেজে হাসদের নেতা হিশাবে তিনি নিজেকে হাজির কিম্বা দাবি করেন নি। বরং তিনি শেখ মুজিবরের নেতৃত্বকে সামনে রেখে নিভৃতে তাঁর ভাবনাকে নির্মাণ করে গিয়েছে। অগ্রাধিকার দিয়েই তাঁর ভাবনাকে নির্মাণ করে গিয়েছিল – যা আগামি বাংলাদেশ গঠনের অতীত উপাদান ও অভিজ্ঞতা হিশাবে আমামদের সামনে আবার হাজির হয়েছে। শেখ ছিলেন জনগণের মুখ; সিরাজ ছিলেন সংগঠনের মস্তিষ্ক। এই মেলবন্ধনই ছিল স্বাধীনতার সংগ্রামের অপ্রকাশিত এক রূপরেখা, যা ১৯৭১ সালের বিজয়ের অনেক আগেই ভেতরে ভেতরে তৈরি হয়েছিল।
তবে তাঁর এই সংগঠক জীবন ছিল নিঃশব্দ, অন্তরালময়। তিনি যেমন গোপনে সংগঠন গড়েছেন, তেমনি নিজের ভূমিকা আড়াল রাখতেও পারদর্শী ছিলেন। এতে বোঝা যায় যে সিরাজুল আলম খান রাজনীতিকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে না দেখে নির্মাণের ক্ষেত্র হিসেবে দেখতেন। তাঁর কাছে রাজনীতি মানে ছিল “জনগণের আত্মপ্রতিষ্ঠা”।
তাঁর সম্পর্কে আলোচনা তাই এভাবে শুরু হতে পারে যে সিরাজুল আলম খান কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশ গঠনের এক নীরব রূপকার। তিনি আমাদের শেখান—রাজনীতি মানে স্রেফ ক্ষমতা দখলের পরিসর বা ক্ষমতার প্রতিযোগিতা না, বরং গণসংগঠন গড়ে তোলা যেন জনগণের সামষ্টিক গাঠনিক শক্তির বিকাশ ঘটতে পারে ; মুক্তি মানে মানুষের সম্ভাবনার কল্পনায় সীমান্ত টানা নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠির দীর্ঘ রুহানি বা আত্ম-উদ্বোধনের পথ নির্মাণ করা যেন ভবিষ্যৎ গঠন করবার কর্তব্যগুলো আমরা চিনতে পারি ও করতে পারি।
তাঁর জীবনীচর্চা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি রাষ্ট্রের জন্ম কেবল প্রতিরোধ নয়, নির্মাণের প্রশ্নও বটে। সিরাজুল আলম খানের জীবন সেই নির্মাণের একটি প্রতিশ্রুতি—যেখানে মানুষ নিজেই তার রাষ্ট্র ও ভবিষ্যৎ রচনা করে।





