মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কেন, মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা সিটির দুই প্রশাসকের কাজ কি?
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় বিবেচনা এবং আনুগত্যভিত্তিক নিয়োগের অভিযোগে সমালোচিত।৷৷ রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার রাস্তায় কুরবানির পশুর বর্জ্যসহ ময়লা থাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে বিষয়টি প্রশংসার ! এবং জনদায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। অতীতেও দেখা গেছে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সময় সাধারণ অগ্নি কান্ড থেকে শুরু করে প্রায় সকল ঘটনাতেই প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে বলা হত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে,
ঢাকা সিটি করর্পোরেশনের দুই ভাগে দুই প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার ওপর আছে, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী,কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক নিজে গাড়ি চালিয়ে পুরো ঢাকা ঘুরে কেন দায়িত্ব অবহেলার জন্য বরখাস্তের নির্দেশ দিতে হলো? সবই যদি প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে হবে তাহলে যারা বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দায়িত্বে বসে আছেন তাদের কাজ কি? প্রশাসক আর মন্ত্রীদের দায়িত্ব গাফেলতির শাস্তি কি?! সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে কুরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে ব্যর্থতার ঘটনায় নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্তের ঘটনা আবারও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও দায়িত্ব নির্ধারণের প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। জনমনে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে,ব্যর্থতার দায় কি শুধুই অধস্তন কর্মকর্তাদের, নাকি উচ্চপদস্থ প্রশাসক ও নীতিনির্ধারকদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আসা উচিত?
আরও পড়ুন: শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম
রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা, যোগ্যতা ও পেশাদারিত্বের পরিবর্তে যখন রাজনৈতিক আনুগত্য প্রধান বিবেচনায় পরিণত হয়, তখন প্রশাসনের ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের অদক্ষতা, সমন্বয়হীনতা ও নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হয়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর, সংস্থা ও করপোরেশনে এমন ব্যক্তিদের পদায়নের অভিযোগ রয়েছে, যাদের অনেকের প্রশাসনিক দক্ষতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা কিংবা সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। এর ফলে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জনগণের সেবামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
সম্প্রতি ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় কুরবানির পশুর বর্জ্য সময়মতো অপসারণ না হওয়ায় জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। পরে সরকারপ্রধানের সরাসরি হস্তক্ষেপে দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। যদিও এই পদক্ষেপকে অনেকে তাৎক্ষণিক জবাবদিহিতার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন, তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি একই সঙ্গে প্রশাসনিক দুর্বলতারও ইঙ্গিত বহন করে। কারণ, একটি নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যদি শেষ পর্যন্ত সরকারপ্রধানকেই সরাসরি তদারকি করতে হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসক, মন্ত্রী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
আরও পড়ুন: জলসীমার অতন্দ্র প্রহরী থেকে মানবতার বাতিঘর: বেসামরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো প্রতিষ্ঠানে ব্যর্থতার দায় কেবল মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নয়; বরং নেতৃত্ব পর্যায়ের ব্যক্তিদেরও বহন করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, অধস্তন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও উচ্চপদস্থদের দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়। এতে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের বৈষম্যমূলক সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে প্রকৃত জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পদায়ন প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তারা পিছিয়ে পড়েন। এতে প্রশাসনের ভেতরে হতাশা তৈরি হয় এবং কর্মক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনায় সরকারি দপ্তরগুলোতে সমন্বয়হীনতা, দায়িত্বে অবহেলা এবং নাগরিক সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। নাগরিকরা মনে করছেন, প্রশাসনে কার্যকর সংস্কার ছাড়া শুধু ব্যক্তি বদল করে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে দায়িত্ব ও ব্যর্থতার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে।
সুশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক বাস্তবতা থাকলেও জনগুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সততাকে। অন্যথায় প্রশাসনিক স্থবিরতা আরও বাড়বে এবং জনগণের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা দুর্বল হবে।
অযোগ্য ও অদক্ষ প্রশাসনের ফলাফল শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ জনগণকেই। প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধীরগতি নেমে আসে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং জনগণের দৈনন্দিন দুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার যখন প্রশাসনের স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে,গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণই শেষ বিচারক। সাধারণ ভোটাররা সরকারের প্রতিটি কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা দেখছে কোথায় যোগ্যতার মূল্যায়ন হচ্ছে, আর কোথায় রাজনৈতিক আনুগত্যকে রাষ্ট্রের স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হচ্ছে। তাই সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি দক্ষ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা, যাতে জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করা যায়।
বর্তমান বাস্তবতায় সরকারপ্রধানের উচিত প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে দক্ষতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে দায়িত্ব প্রদান করা। কারণ একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো একটি দক্ষ, নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রশাসন।





