দেশে মাদকাসক্ত ৮২ লাখ মানুষ : গবেষণা

Any Akter
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:১২ পূর্বাহ্ন, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে মাদক ব্যবহার এখন আর আড়ালে থাকা কোনো বিষয় নয়; এটি ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮১ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক সেবন করছে। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

রোববার (২৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মাদক ব্যবহার দেশের স্বাস্থ্য, সমাজ ও অর্থনীতির ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে এখানে সিগারেটকে মাদক হিসেবে বিবেচনায় আনা হয়নি।

আরও পড়ুন: নির্মাণাধীন ভবনের রড পড়ে যুবকের মৃত্যু, কনকর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত গবেষণাটি বিএমইউ ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে সম্পন্ন করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নেটওয়ার্ক স্কেল-আপ মেথড প্রয়োগ করে দেশের আট বিভাগের ১৩ জেলা ও ২৬ উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

গবেষণার ফল অনুযায়ী, বিভাগভেদে মাদক ব্যবহারের হারে বড় ধরনের তারতম্য রয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগে মাদক ব্যবহার সবচেয়ে বেশি (৬.০২ শতাংশ)। এর পরেই রয়েছে রংপুর (৬.০০ শতাংশ) ও চট্টগ্রাম (৫.৫০ শতাংশ)। অন্যদিকে রাজশাহী (২.৭২ শতাংশ) এবং খুলনা বিভাগে (৪.০৮ শতাংশ) তুলনামূলকভাবে কম হার লক্ষ্য করা গেছে।

আরও পড়ুন: ভূয়া ঠিকানায় নিয়োগে একই কর্মস্থলে ১১ বছর

ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে ঢাকা বিভাগ—প্রায় ২২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ এখানে মাদক সেবন করছে। চট্টগ্রাম বিভাগে এই সংখ্যা ১৮ লাখ ৭৯ হাজার এবং রংপুর বিভাগে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার।

মাদক প্রকারভেদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা। গাঁজা ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ ৮০ হাজার। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন (প্রায় ২৩ লাখ), অ্যালকোহল (২০ লাখ) এবং কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইন। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার, যাদের মধ্যে এইচআইভি ও হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, একজন মাদক ব্যবহারকারী গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ছয় হাজার টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করেন। একই ব্যক্তি একাধিক ধরনের মাদক সেবন করতেও পারেন।

বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাদক ব্যবহারের শুরুটা খুব অল্প বয়সেই হচ্ছে। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ করেন এবং ৫৯ শতাংশ শুরু করেন ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে।

মাদক ব্যবহারের পেছনে বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, পারিবারিক অস্থিরতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকার বিষয়গুলোকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উদ্বেগজনকভাবে, প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন—মাদক সহজেই পাওয়া যায়।

চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিয়েও হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। মাত্র ১৩ শতাংশ ব্যবহারকারী কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন। যদিও অর্ধেকের বেশি মানুষ মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তার অভাবে বেশিরভাগই সফল হতে পারেননি।

মাদক ব্যবহারকারীরা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা (৬৯ শতাংশ), কাউন্সেলিং (৬২ শতাংশ) এবং কর্মসংস্থান সহায়তাকে (৪১ শতাংশ) সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে ৬৮ শতাংশ ব্যবহারকারী সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, মাদক সমস্যা কেবল নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। “আমরা মনে করি মাদকাসক্তরা অন্য কেউ, কিন্তু বাস্তবে আমাদের পরিবার ও সন্তানরাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে,”—বলেন তিনি।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানান, মাদক প্রতিরোধ পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। তিনি বলেন, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা সম্প্রসারণে ঢাকা ছাড়াও সাত বিভাগে ২০০ শয্যার পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক সমস্যা মোকাবিলায় কেবল দমনমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণ—এই সবকিছু একসঙ্গে বাস্তবায়ন করলেই সংকট মোকাবিলা সম্ভব।