এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা

শিক্ষায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় তবুও ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা

Sanchoy Biswas
খালিদ আহমেদ
প্রকাশিত: ৬:০৪ অপরাহ্ন, ১৩ মে ২০২৬ | আপডেট: ৮:০১ অপরাহ্ন, ১৩ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় গত ৯ দিনে অনুপস্থিত ছিলেন ১ লাখ ৯৯ হাজার, ৮৮৩ শিক্ষার্থী। এ সময় বহিস্কার হয়েছেন ১৬৮ জন। গত ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছিল ২০২৬ সালের এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষা। সারা দেশে এবার মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী এই পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। শিক্ষার আনুষ্ঠানিক সনদ না পেয়েই শিক্ষাজীবন শেষ করা এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে এগিয়ে মেয়েরা। বিনা মূল্যে বই দেওয়া, উপবৃত্তি ও স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের মতো হাজার কোটি টাকার সরকারি কর্মসূচির পরও ঝরে পড়ার এমন চিত্র ‘উদ্বেগজনক’, বলছেন শিক্ষাবিদরা। 

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এমনিতেই মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা ব্যয় অনেক বেশি। স্কুল-মাদ্রাসার খরচের পাশাপাশি অপরিহার্য ব্যয় হচ্ছে কোচিং-প্রাইভেট আর নোট-গাইড। এছাড়া খাতা-কলম ও আনুষঙ্গিক ব্যয় আছে। এসময় এ ধরনের অনুপস্থিতি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।  

আরও পড়ুন: ঈদুল আজহা ও গ্রীষ্মকালীন অবকাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসছে দীর্ঘ ছুটি

এদিকে, চলমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিজেদের বোর্ডের অধীন পরীক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। এ জন্য অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের তথ্য নির্ধারিত গুগল ফরমে ২৭ মের মধ্যে পাঠাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অনুরোধ করেছে বোর্ড।

এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গতবারের চেয়ে প্রায় এক লাখ পরীক্ষার্থী কম। বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা দিচ্ছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, এবার পরীক্ষায় অনুপস্থিতিও অন্যান্যবারের তুলনায় বেশি। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের বোর্ডের অধীন পরীক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিল ঢাকা বোর্ড।

আরও পড়ুন: কমপ্লিট শাটডাউনে অচল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধে চরম অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থীরা

গত ১৩ মে স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে ঢাকা বোর্ড। চিঠিতে গুগল ফরমে কীভাবে তথ্য পাঠাতে হবে সে জন্য পাঁচটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো-প্রত্যেক অনুপস্থিত পরীক্ষার জন্য পৃথক ছকে তথ্য পাঠাতে হবে। যতজন অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর তথ্য পাঠানো হবে, ততবার লিংকে ক্লিক করে পৃথক ফরমে তথ্য দিতে হবে; একজন পরীক্ষার্থীর জন্য একাধিক ছক বা ফরম পূরণ করা যাবে না; অনুপস্থিতির কারণ জানার জন্য পরীক্ষার্থী বা অভিভাবকের সঙ্গে সশরীরে বা মুঠোফোনের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং কোন কোন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত, তা জানার জন্য সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

তথ্য চেয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, চলমান এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিদিন কিছুসংখ্যক পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকছে, যা উদ্বেগজনক। এ জন্যই অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রথম দিনে অনুপস্থিত ২৫,৪০৮ পরীক্ষার্থী, বহিষ্কৃত ৬। ২য় দিনে অনুপস্থিত ২৬,৮৬৫ পরীক্ষার্থী, বহিষ্কৃত ১৯ । তৃতীয় দিনে অনুপস্থিত ৩৪ হাজার, বহিষ্কার ৪০ জন। চতুর্থ দিনে অনুপস্থিত ৩২ হাজার, বহিষ্কার ৪৯ জন। পঞ্চম দিনে অনুপস্থিত ২১ হাজার ৬১০ জন ও  বহিষ্কার ৫। ষষ্ঠ দিনে অনুপস্থিত প্রায় ২৯ হাজার ও বহিষ্কার ৩২জন। ৭ম দিনে অনুপস্থিত ২০ হাজার ৬০৪ জন, বহিস্কার ৮ জন। অষ্টম দিনে অনুপস্থিত সাড়ে ২৯ হাজার ও বহিষ্কার ৪১ জন। নবম দিন গত রবিবার অনুপস্থিত ৩১ হাজার ও বহিষ্কার ৯ শিক্ষার্থী । 

শিক্ষার্থীদের স্কুলে আনা এবং তাদের ধরে রাখার লক্ষ্যে সরকার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে। বিনা মূল্যে বই দেওয়া, উপবৃত্তি ও স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের মতো কর্মসূচি পালনে সমুদয় অর্থ ব্যয় হলেও গত দুই বছরে এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়া অত্যন্ত ‘উদ্বেগজনক’ মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘প্রাথমিকের চেয়ে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার ব্যয় বেশি। অনেক অভিভাবক এ ব্যয় বহন করতে পারেন না। এ ছাড়া শিক্ষায় কোচিং বাণিজ্য ও নোট-গাইডের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। স্কুলগুলোতে আরও অনেক ব্যয় আছে। এ কারণে দরিদ্র ও কম আয়ের মানুষের শিক্ষার সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলায় না। এক কথায়, বর্ধিত শিক্ষার ব্যয় মেটাতে না পারাই ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, শিক্ষার্থী যে কারণেই ঝরে পড়ুক না কেন, তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য পরিকল্পনা করা দরকার। উপবৃত্তির টাকার পরিমাণ ও আওতা বাড়াতে হবে। বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে। সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষাকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শিক্ষকেরা যেন শ্রেণিতে পাঠদানে আরও মনোযোগী হন, তা কঠোরভাবে তদারক করতে হবে। যেসব শিক্ষার্থী সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যালয় ত্যাগ করেছে, তাদের দ্রুত ফিরিয়ে আনার জন্য সামাজিক-আর্থিক সহায়তা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়া রোধে গতানুগতিক পদ্ধতির বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে হবে। নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা একেবারে বিনামূল্যে না হলেও স্বল্পমূল্যে যাতে পড়াশোনা করতে পারে সেই উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি ঝরে গেছে এমন শিশুদের কর্মমুখী একটি কোর্সের মাধ্যমে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যেতে পারে।