প্রশ্নের মুখে শিক্ষার ভিত,সমালোচনার ঝড়
- এইচএসসিতে ৪৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর মৌলিক জ্ঞান অর্জন না হওয়ার দায় কার
- গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার
- শিক্ষার মান নিয়ে অভিভাবকদের ক্ষোভ ও উদ্বেগ
প্রবাদ আছে, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। একটি দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা। কিন্তু বর্তমান সময়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নানা প্রশ্ন, অনিয়ম, সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনার মুখে পড়েছে। শিক্ষার মান, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান অর্জন নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক। ফলে ভালো রেজাল্ট করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ গত শনিবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এতে পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। যা গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বোর্ডভেদে ফলাফলের বড় ব্যবধান এবং বিপুল শিক্ষার্থীর বিষয়ভিত্তিক অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনাও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষার মান নিয়ে। ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অভিভাবকরা।
সংশ্লিষ্ট্ররা বলছেন, এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ভয়াবহ বিপর্যয় হয়েছে। এ দায় এড়ানো কঠিন। কারণ টানা ১২ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডিতে পৌঁছান একজন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে তাকে পার হতে হয় নানা শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা, নির্বাচনী পরীক্ষা ও একাধিক মূল্যায়ন ধাপ। অথচ এত দীর্ঘ প্রস্তুতির পরও এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থী। পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে, যা গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বোর্ডভেদে ফলাফলের বড় ব্যবধান এবং বিপুল শিক্ষার্থীর বিষয়ভিত্তিক অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনাও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষার মান নিয়ে। এবার সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের পাঁচটিতেই অর্ধেকের বেশি পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। কোনো বোর্ডে পাসের হার ৬০ শতাংশ ছাড়ালেও কোথাও তা ৪৫ শতাংশের নিচে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলেও রয়েছে বড় ফারাক।
আরও পড়ুন: এইচএসসির পাসের হার ২০ বছরে সর্বনিম্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল কিংবা সনদ অর্জন নয়; বরং শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তব চিত্রে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার গুণগত মানের চেয়ে ফলাফল ও সনদ অর্জন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, চিন্তাশক্তি ও বাস্তবমুখী দক্ষতা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব, শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত শিক্ষকের অনুপস্থিতি, শিক্ষা উপকরণের সংকট এবং শহর ও গ্রামের শিক্ষার বৈষম্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক শিক্ষার্থী মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি কোচিংনির্ভরতা ও মুখস্থবিদ্যার প্রবণতা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহল মনে করছেন, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে হলে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি এবং জবাবদিহিমূলক শিক্ষা প্রশাসন। শুধু নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করলেই হবে না, তার কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কেউ পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, কেউবা পরীক্ষা পদ্ধতি ও মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তবে সমালোচনার পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য গঠনমূলক আলোচনা ও কার্যকর উদ্যোগও জরুরি। কথা হয় ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান এর সঙ্গে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা একের পর এক শ্রেণি পার হলেও প্রয়োজনীয় শিখন অর্জন করতে পারছেন না। এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষকসংকট, দক্ষ শিক্ষকের অভাব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি। ফলে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা এখন পরীক্ষার ফলাফলেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, এবারের ফলাফল শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, অত্যন্ত আশঙ্কাজনকও। এই ফলাফলের মাধ্যমে আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থার এক ধরনের রোগনির্ণয় হয়ে গেছে। শিক্ষাব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর, কতটা ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। গত দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ পয়েন্ট। ২০২৪ সালে যেখানে প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে প্রায় ৭৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, সেখানে এবার উত্তীর্ণ হয়েছেন প্রায় ৫২ জন। ফলাফলের এমন পরিবর্তনের পেছনে পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নপদ্ধতির কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। বিশেষ করে কয়েক বছর ধরে তুলনামূলক বেশি পাসের হারের পর হঠাৎ বড় পতন ঘটায় মূল্যায়নের ধারাবাহিকতা নিয়েও আছে আলোচনা। অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, প্রতিবছর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য একটি নীতিমালা থাকে। সেখানে কী ধরনের উত্তরের জন্য কত নম্বর দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হয়। ফলে মূল্যায়ন নীতিমালার প্রভাব ফলাফলের ওপর পড়তে পারে।
আরও পড়ুন: ইংরেজি ভার্সনে পাসের হার ১০০%, গড় পাসের হার ৯৯.৮৩%
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে আইসিটি বাধ্যতামূলক হলেও সব কলেজে বিষয়টির শিক্ষকপদ সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে আইসিটি ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে সমস্যা শুধু শিক্ষকের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয় বলে মনে করেন তিনি। অনেক ক্ষেত্রে দক্ষ ও মানসম্মত শিক্ষকেরও ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি কলেজগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধার ঘাটতিও সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। ব্যানবেইসের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪ হাজার ৮৭৬টি কলেজে আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন ৫ হাজার ৫ জন। এর মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন ১ হাজার ৪৭৯ জন। অন্যদিকে ২০৭টি কলেজে কম্পিউটার সুবিধা নেই, যার মধ্যে ১৬৪টিই উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ।
৪৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর মৌলিক জ্ঞান অর্জন না হওয়ার দায় কার: ১২ বছরের বেশি সময় স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করেও একজন শিক্ষার্থী যদি একটি বিষয়ে পাস নম্বর অর্থাৎ ৩৩ তুলে নিতে না পারে, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় কার। শিক্ষার্থীর, নাকি যে শিক্ষাব্যবস্থা তাকে এত বছর পড়িয়েছে, তার? রাষ্ট্রের অর্থ, পরিবারের সঞ্চয় ও অভিভাবকদের শ্রমের বিনিময়ে একজন শিক্ষার্থীর অন্তত মৌলিক জ্ঞান অর্জনের কথা। কিন্তু সেই ন্যূনতম প্রত্যাশাও পূরণ না হলে শুধু বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে দায়ী করে কি দায়িত্ব এড়ানো যায়। সর্বশেষ গত শনিবার প্রকাশিত ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফল এই প্রশ্ন সামনে এনেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অকৃতকার্য হয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। দুই বছরে পাসের হার কমেছে ২৫ দশমিক ৬৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। একই সময়ে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ থেকে কমে ৪০ হাজার ৮৪ হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফলের ব্যাখ্যায় মূল্যায়ন কঠোর হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। আগের বছরগুলোতে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা ছিল, এখন যথাযথভাবে খাতা দেখা হচ্ছে, এমন বক্তব্যও রয়েছে। কিন্তু মূল্যায়ন কঠোর হলেই কি বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়াকে শিক্ষার মানোন্নয়ন বলা যায়। এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র। তবে ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে মোট ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন অকৃতকার্য হয়েছে। ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলোতে এত শিক্ষার্থী মৌলিক জ্ঞান অর্জন করতে পারল না কেন? পাঠদান, শিক্ষকসংকট ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। বোর্ডের ফলের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলের ব্যবধানও বিবেচনার দাবি রাখে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ৪৬ হাজার ৮৬১ জন অংশ নেন। তাদের মধ্যে পাস করেন মাত্র ১২ হাজার ৯১৩ জন। অর্থাৎ প্রায় ৭২ শতাংশ ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি।
শিক্ষার মান নিয়ে অভিভাবকদের ক্ষোভ ও উদ্বেগ: শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা। তাঁদের মতে, শিক্ষার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তন, পরীক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। আয়েশা আকতার নামে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এণ্ড কলেজ এর একজন অভিভাবক বলেন, আমরা সন্তানদের ভালো শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চাই। কিন্তু বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন দেখা গেলেও শিক্ষার প্রকৃত মান কতটা বাড়ছে, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। একই মন্তব্য করেছেন যাত্রাবাড়ি আইডিয়াল স্কুল এণ্ড কলেজ এর আরেক অভিভাবক সুলতানা রহমান। তিনি বলেন, শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেই একজন শিক্ষার্থী প্রকৃত শিক্ষিত হয় না। তার মধ্যে নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও বাস্তব জ্ঞান থাকতে হবে। অথচ এসব বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা, নিয়মিত পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি যথাযথ মনোযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভরতা কমিয়ে শ্রেণিকক্ষেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাদের প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা, পরিকল্পিত পরিবর্তন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। তাঁদের মতে, শিক্ষার ভিত মজবুত করতে হলে সবার আগে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। অভিভাবকদের একটাই দাবি—পরীক্ষা ও সনদনির্ভর নয়, তাঁরা চান মানসম্মত, বাস্তবমুখী ও ভবিষ্যৎ গড়ার উপযোগী শিক্ষা।





