পাহাড়ের নিচে থাকা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে বাড়ি করে দেব: ত্রাণমন্ত্রী
টানা ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ধস যেন দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের জন্য প্রতি বর্ষার অবধারিত দুঃস্বপ্ন। গভীর রাতে ঘুমন্ত মানুষ, শিশু, নারী—মুহূর্তের মধ্যে মাটিচাপা পড়ে ঝরে যাচ্ছে একের পর এক প্রাণ। চলমান বর্ষণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরই মধ্যে সরকার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে সরকারি খাসজমিতে পুনর্বাসন ও বাড়ি নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। জাতীয় সংসদে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, "পাহাড়ের নিচে থাকা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে বাড়ি করে দিতে সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ভবিষ্যতে যাতে পাহাড়ধসে আর একটি প্রাণও না ঝরে, সেজন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।"
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, সাম্প্রতিক দুর্যোগে চট্টগ্রামে পাঁচজন, কক্সবাজারে ১৯ জন, রাঙ্গামাটিতে একজন এবং বান্দরবানে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতি বছর একই ধরনের দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এই চক্র ভাঙতে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন করা ছাড়া বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন: তুরস্কের সহযোগিতায় বগুড়ায় হবে ড্রোন কারখানা: প্রতিমন্ত্রী
মন্ত্রী জানান, সরকারের হাতে পর্যাপ্ত খাসজমি ও আবাসন মন্ত্রণালয়ের জমি রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংসদ সদস্যদের সহযোগিতায় এসব জমিতে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য স্থায়ী আবাসন নির্মাণ করা হবে। তিনি বলেন, "আমরা শুধু ত্রাণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে চাই না। মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করতে চাই।"
সরকারের এই ঘোষণার মধ্যেই বৃহস্পতিবার ভোরে বান্দরবানের লামা উপজেলায় ঘটে হৃদয়বিদারক এক ঘটনা। আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া (পাগলির ঝিরি) এলাকায় পৃথক দুটি পাহাড়ধসে দুটি পরিবারের পাঁচজন নিহত হন।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ
এর মধ্যে একটি পরিবারের তিন সদস্য নিজ বসতঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপা পড়ে মারা যান। নিহতরা হলেন মো. ইউনুস (৪০), তাঁর স্ত্রী রানু আক্তার (৩৫) এবং তাঁদের পাঁচ বছরের ছেলে মো. সোলেমান। ভোররাতে বিকট শব্দ শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেন।
একই এলাকায় আরেকটি পাহাড়ধসে পৃথক একটি পরিবারের স্বামী-স্ত্রী নিহত হন। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একই এলাকায় দুটি পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার জানিয়েছেন, দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আইনগত কার্যক্রম চলছে।
একই সময়ে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার মছনিয়াকাটা এলাকায় টানা বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ধসে আরও দুইজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত একজন। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি এখনও অব্যাহত রয়েছে। ফলে আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী সংসদে বলেন, সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে ৪১টি, কক্সবাজারে ৬৪০টি, রাঙ্গামাটিতে ২১টি, খাগড়াছড়িতে ১৩৫টি এবং বান্দরবানে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছেন।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্যানিটেশন, শিশু খাদ্য, শুকনো খাবার এবং তিন বেলা রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।
ত্রাণ কার্যক্রম জোরদারে সরকার নতুন করে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও খাদ্যসহায়তা বরাদ্দ দিয়েছে। চট্টগ্রামের জন্য ২৫ লাখ টাকা ও ৩০০ টন চাল, কক্সবাজারের জন্য ২০ লাখ টাকা ও ২৫০ টন চাল এবং রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের জন্য ১০ লাখ টাকা করে এবং ২০০ টন করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রতিটি জেলায় ১০ লাখ টাকা এবং ২০০ টন চাল দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ ত্রাণ তহবিল থেকেও প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত জেলার জন্য ২০ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব দুর্গত এলাকায় অবস্থান করছেন এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সংসদ অধিবেশন মূলতবি থাকার সুযোগে পাহাড়ি এলাকার সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে ত্রাণ কার্যক্রম তদারকি করার আহ্বান জানান ত্রাণমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়িয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের নিচে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরে ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানান।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, শুধু অতিবৃষ্টি নয়, অবৈধভাবে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণ এবং দারিদ্র্যের কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢালে বসবাস করছে। ফলে প্রতি বর্ষায় একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।
তাদের মতে, কেবল দুর্যোগের সময় ত্রাণ বিতরণ কিংবা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় চিহ্নিত করে সেখানে বসবাস সম্পূর্ণ বন্ধ করা, বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা, পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার সমন্বিত উদ্যোগই পারে প্রতিবছরের এই মৃত্যুমিছিল থামাতে।
এবারের বর্ষায় প্রাণহানির সংখ্যা আবারও প্রমাণ করেছে, পাহাড়ধস আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি এখন একটি পুনরাবৃত্ত মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। তাই সরকারের পুনর্বাসন উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে হয়তো আগামী বর্ষায় কোনো শিশু, কোনো মা কিংবা কোনো পরিবারকে আর গভীর রাতে পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারাতে হবে না।





