সিলেট-চট্টগ্রামসহ ১৫ জেলার মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান, তিন দিন থাকতে পারে সংকট
টানা বর্ষণে বাড়ছে নদীর পানি, চার বিভাগে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর-পূর্ব, পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের অন্তত ১৫টি জেলায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। যদিও বর্তমানে দেশের প্রধান নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে, তবুও অব্যাহত বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে নিম্নাঞ্চলের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি তিন দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুধবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রকাশিত পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির প্রভাবে কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, ফেনী, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরও পড়ুন: ১২ জেলায় ঝড়ের আশঙ্কা, নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, সম্ভাব্য আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি প্রায় তিন দিন স্থায়ী হতে পারে। এরপর শনিবার থেকে ধীরে ধীরে নদীর পানি কমতে শুরু করলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে দেশের প্রধান নদীগুলোর পানি এখনও বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও অব্যাহত বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢল পরিস্থিতিকে দ্রুত বদলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন: ১৭ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা, নদীবন্দরে ১ নম্বর সংকেত
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানায়, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। একই সময়ে সুরমা-কুশিয়ারা, গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, দুধকুমার ও ধরলা নদীর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত তিন দিন ধরে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত ২০০ মিলিমিটারেরও বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। চট্টগ্রামে মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৩৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ।
গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে অতি ভারী এবং সিলেট ও বরিশাল বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে ভারতের মেঘালয়, ত্রিপুরাসহ উজানের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে পড়তে শুরু করেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী চার দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং সংলগ্ন ভারতীয় উজান এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক নিচু এলাকায় পানি জমতে শুরু করেছে এবং স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতির ওপর নজরদারি জোরদার করেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্ভাব্য বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে নদী পারাপার না করা, প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও জরুরি সামগ্রী প্রস্তুত রাখা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে। ফলে আকস্মিক বন্যা এখন আর মৌসুমি দুর্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্রমেই ঘন ঘন ঘটতে থাকা একটি বড় মানবিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে। তাই আগাম পূর্বাভাস, স্থানীয় প্রস্তুতি এবং দ্রুত সমন্বিত ত্রাণ ও উদ্ধারব্যবস্থা জোরদার করাই সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।





