মাদক-জুয়ার প্রতিবাদ করায় হামলা, হাসপাতালে মারা গেলেন শিক্ষক

Sadek Ali
আবু বক্কর সিদ্দিক, লালমনিরহাট
প্রকাশিত: ৮:৩৭ পূর্বাহ্ন, ২২ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৯:১৭ পূর্বাহ্ন, ২২ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় হামলার শিকার লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক আরিফুল ইসলাম (৩৫) আর নেই। টানা ২১ দিন বিভিন্ন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাতে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব সজীব।

নিহত আরিফুল ইসলাম লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা গন্ধমরুয়া গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে। তিনি লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে ৪১তম বিসিএসের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: রায়পুরে সাবেক চেয়ারম্যানের বাড়িতে ককটেল বিস্ফোরণ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ

সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান

মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদক, অনলাইন জুয়া, বাল্যবিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ নামে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। এ আন্দোলনের সঙ্গে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, শিক্ষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা যুক্ত রয়েছেন।

আরও পড়ুন: রুহুল কবির রিজভী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নির্বাচিত: উলিপুরে আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ

এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষক আরিফুল ইসলাম তাঁর নিজ এলাকা দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া গ্রামের মাদক ও অনলাইন জুয়া চক্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, রহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে কয়েকজন সেখানে অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। আরিফুল তাদের এসব কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসার আহ্বান জানান এবং তা বন্ধ না করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানানোর কথা বলেন।

বাড়ি ফেরার পথে হামলা

মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে আরিফুল ইসলামের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে গুরুতর জখম করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরে স্থানীয়রা রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। প্রথমে এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২১ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার রাতে তাঁর মৃত্যু হয়।

নবজাতক সন্তানের মুখ দেখা হলো না

আরিফুলের মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো—হামলার মাত্র কয়েকদিন পরই তাঁর পরিবারে নতুন অতিথির আগমন ঘটে। গত ৬ আগস্ট তাঁর স্ত্রী অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন।

কিন্তু হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে থাকা আরিফুল তাঁর নবজাতক সন্তানের মুখ দেখার সুযোগ পাননি। সমাজ থেকে মাদক ও জুয়ার মতো অপরাধ দূর করার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়া একজন শিক্ষককে হারিয়ে তাঁর পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তা ও শোকের মধ্যে পড়েছে।

প্রধান অভিযুক্ত গ্রেপ্তার

এ ঘটনায় আরিফুলের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বাদী হয়ে গত ২ আগস্ট আদিতমারী থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় রহিদুল ইসলামকে প্রধান করে মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার পর প্রধান অভিযুক্ত রহিদুল ইসলাম আত্মগোপনে চলে যান বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়। পরে গত ১২ আগস্ট রাতে রাজধানীর হাতিরঝিলের নয়াটোলা এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। র‍্যাব-১৩-এর পক্ষ থেকেও তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল।

মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে কয়েকজন আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়েছেন বলে বাদীপক্ষ জানিয়েছে।

মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা

শুক্রবার রাতে আরিফুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর নিজ এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মামলার আসামিদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়।

আদিতমারী থানার ওসি নাজমুস সাকিব সজীব বলেন, আরিফুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্তদের বাড়িতে ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে এবং তিনি নিজেও ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন।

এদিকে কলেজশিক্ষক আরিফুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও স্থানীয়রা। একই সঙ্গে এলাকায় মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান জোরদারের দাবিও উঠেছে।