হাজার হাজার নিখোঁজ শিশু কোথায় যাচ্ছে
প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও থেকে আসছে শিশু নিখোঁজের খবর। উদ্বিগ্ন অভিভাবক, দিশেহারা পরিবার আর প্রশাসনের তৎপরতা—সব মিলিয়ে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। কিন্তু ঠিক কী কারণে শিশুরা এভাবে নিখোঁজ হচ্ছে? এটি কি অসচেতনতা, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র? একটি শিশু নিখোঁজ হওয়া যেকোনো অভিভাবকের জন্য অত্যন্ত চরম উদ্বেগ এবং ভীতিজনক পরিস্থিতি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৩৮ জনের সন্ধান এখনো মেলেনি। ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
পুলিশ জানায়, ওই সময়ে নিখোঁজ ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, নিখোঁজ শিশুদের ১৩ শতাংশের সন্ধান এখনো মেলেনি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব সংবাদে নিখোঁজ শিশুদের পরবর্তী অবস্থা, অর্থাৎ কতজন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, সে তথ্য উল্লেখ না থাকায় শিশু নিখোঁজের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রতিফলিত হয়নি। এতে এ বিষয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিভ্রান্তি নিরসন ও বিষয়টি আরও স্পষ্ট করতে পুলিশ সদর দপ্তর সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের বিষয়ে ৪৭৪টি জিডি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ জনকে এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
আরও পড়ুন: বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও সংগঠক সৈয়দা তৈয়বা বানু মারা গেছেন
একই সময়ে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৯৭০ জন এখনো উদ্ধার হয়নি। পুলিশের ভাষ্য, শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে ঘুরতে গিয়ে পথ ভুলে, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারায় এবং একাকী বাসায় ফিরতে গিয়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়। অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে লজ্জার ভয়ে পালিয়ে থাকা, স্বাধীন জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা আদায়ের কৌশল, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবের মতো কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ আরও জানিয়েছে, বর্তমানে পুলিশি সেবা সহজীকরণের অংশ হিসেবে অনলাইন জিডি সুবিধা চালু রয়েছে। ফলে নিখোঁজের বিষয়ে জিডির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
হাজার হাজার নিখোঁজ শিশু কোথায় যাচ্ছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘শিশু নিখোঁজের ক্রমবর্ধমান ঘটনার পেছনে শুধু পারিবারিক বা মানসিক কারণ নয়, বরং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।’
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের কখনও ডাকে না: ওয়েব সভাপতি নাসরিন আওয়াল
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। শিশু নিখোঁজ হওয়ার ক্ষেত্রে কয়েক ধরনের পরিস্থিতি রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো— শিশু পাচারকারীদের সক্রিয়তা।’
ড. তৌহিদুল হক উল্লেখ করেন, ‘পাচার হওয়া শিশুদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়। জোর করে যৌনকর্মে বাধ্য করা হয়, কন্যাশিশুদের দেশের বাইরে সেক্স হাউসে বিক্রি করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি করা হয়। নির্দিষ্ট সময় বন্দি রেখে শিশুদের বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষা করানো হয়। এখন শিশুদের ব্যবহার করে অশ্লীল কনটেন্টও তৈরি করা হচ্ছে।’ এ ছাড়া পারিবারিক দূরত্ব ও মনোমালিন্যের কারণেও অনেক শিশু প্রতিশোধপরায়ণ ও হতাশ হয়ে ঘর ছাড়ে বলে মনে করেন তিনি।
ড. তৌহিদুল হক অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, ‘শিশু নিখোঁজ হলে অধিকাংশ মানুষ প্রথমে নিজেদের মধ্যে কিংবা আত্মীয়স্বজন ও আশপাশে খোঁজাখুঁজি করেন। ফলে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। আমরা বলব, প্রথমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যান, তারপর নিজেদের মধ্যে খোঁজ নিন।’ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জনঘনত্ব বেশি, তাই স্কুলের সামনে এবং খেলার মাঠ এলাকায় এসব ঘটনা বেশি ঘটছে। তাই এসব স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।’
মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী ৩৭ বছর ধরে নারী ও শিশু পাচার নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, এখন সাইবারক্রাইম অনেক বড় একটা কারণ শিশু পাচারের ক্ষেত্রে। শিশুরা ঘরে বসেই অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কন্যা শিশুদের ফিরিয়ে আনা হলেও তারা পরিবারে ফিরে যেতে পারে না। তাই তিনি পাচার রোধে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেওয়া, এসব বিষয়ে দক্ষ পুলিশ, সাংবাদিক ও সরকারি আইনজীবী বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে প্রকাশ ও পাঠ্যসূচিতে এমন ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘এত সংখ্যক শিশু নিখোঁজ হওয়া মোটেও স্বাভাবিক নয়। বরং এটি গভীর উদ্বেগের কারণ।’ তিনি মনে করেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, ‘সরকারকে এই ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি শিশু নিখোঁজের পেছনে থাকা চক্র বা নেটওয়ার্ককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালিত হেল্পলাইন ১০৯-এর ইনচার্জ রাইসুল ইসলাম বলেন, সাধারণত ঢাকা শহরে কিডন্যাপের ফোন বেশি আসে। তারা স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেন। জরুরি সহায়তার হেল্পলাইন ৯৯৯ থেকে জানা যায়, লঞ্চঘাট, রেললাইন থেকে শিশু হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তারা বেশি ফোন কল পান। এখন অনেক মাদ্রাসায় বলাৎকারের ভয়েও শিশুরা পালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে শিশু পাচারের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের ‘স্টপিং দ্য ট্রাফিকিং’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নারী ও শিশু পাচারের ঝুঁকি হিসেবে জোরপূর্বক শ্রম, যৌন শোষণ, শিশুবিয়ে এবং অনিরাপদ অভিবাসনের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অপ্রাপ্ত বয়স্ক অনেক কিশোর-কিশোরী এখন টিকটক ও সামাজিক মাধ্যমে অপরিচিত অনেকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াচ্ছে। অনেকে পরিবারের কাউকেই না জানিয়ে ঘর ছাড়ছে। এসব ঘটনায় সাধারণ সাধারণ ডায়রি করা হয়। পরে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধারের পর মামলা করতে চাইলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুপক্ষই আপস করে ফেলে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা ওই অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটিকে ঘরে ফিরিয়ে নেয় না। তারা জিডি করেই দায় সারেন। পুলিশ এখন এ ধরনের ঘটনাই বেশি পাচ্ছে।’





