নির্মল সেন: এক নির্মোহ বিপ্লবীর মহাকাব্য ও গণমানুষের দণ্ডায়মান বিবেক

Sadek Ali
বাহাউদ্দিন গোলাপ
প্রকাশিত: ২:০১ অপরাহ্ন, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১:০০ পূর্বাহ্ন, ১০ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ইতিহাসের মহাকাব্যে এমন কিছু চরিত্রের উদয় হয়, যাঁরা সময়ের স্রোতে গা ভাসাতে নয়, বরং স্রোতের গতিপথ বদলে দিতে আসেন। যখন কোনো পরাক্রমশালী নক্ষত্র নিজ কক্ষপথের আভিজাত্য ত্যাগ করে ধূলিকণার মিছিলে মিশে যায়, তখনই জন্ম নেয় নির্মল সেনের মতো এক একটি নির্মোহ উপাখ্যান। ১৯৩০ সালের ৩ আগস্ট গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার দিঘীরপাড় গ্রামে যখন তাঁর জন্ম, তখন বাংলার আকাশ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বারুদে তপ্ত। শৈশব থেকেই প্রথাগত সচ্ছলতার মোহ ত্যাগ করে মেহনতী মানুষের আর্তনাদকে নিজের কণ্ঠে ধারণ করার যে ব্রত তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তা কোনো সাময়িক আবেগ ছিল না; বরং তা ছিল এক আজন্ম দার্শনিক অঙ্গীকার। ১৯৪৪ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে যখন তিনি ‘বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল’ (RSP)-এ যোগ দেন, তখন থেকেই ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে শোষিতের অধিকারকে ‘পরম সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু করেন। দেশভাগের সেই দহনকালেও যখন অনেকেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মোহে শেকড় বিচ্ছিন্ন হচ্ছিলেন, নির্মল সেন তখন এই বাংলার মাটিকে আঁকড়ে ধরে প্রমাণ করেছিলেন যে, বিপ্লবীর কাছে মানচিত্রের চেয়েও তার ওপর বসবাসরত মানুষের মর্যাদা অনেক বড়।

​নির্মল সেনের দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অন্যতম অগ্নিঝরা অধ্যায় ছিল ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন। তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও সমসাময়িক রাজনৈতিক নথিপত্রে দেখা যায়, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথ যখন উত্তাল, তখন তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে সরকারের বিশেষ নজরদারিতে ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সময় লিফলেট বিলি এবং গোপন সাংগঠনিক সভার সাথে যুক্ত থাকার দায়ে ১৯৫২ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেও তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের স্বপ্ন বুনেছিলেন। তাঁর এই রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পরিক্রমায় তিনি মোট ছয়বার কারাবরণ করেন। এর মধ্যে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের আন্দোলন চলাকালীন তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রায় এক বছর তিনি বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেন। তাঁর কারাজীবনের এই প্রতিটি মুহূর্ত ছিল স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে এক একটি দালিলিক প্রতিবাদ, যা তাঁকে জনমানুষের অকুতোভয় নেতায় পরিণত করেছিল।

আরও পড়ুন: একজন শরিফ ওসমান হাদি: আজ লক্ষ হাদিতে রূপান্তর

​তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ২৫ শে মার্চের কালরাত্রির নৃশংসতার পরেই তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তৎকালীন আরএসপি নেতা হিসেবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করেন। ‘মুক্তিযুদ্ধ সংহতি সমিতি’র মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত গঠনে তাঁর অবদান ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ। কোলকাতার ডেকাস লেনের অস্থায়ী ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ সমন্বয় এবং আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার করত। যুদ্ধের সময় চরম অর্থকষ্টে থাকলেও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দকৃত এক পয়সাও তিনি নিজের স্বার্থে ব্যয় করেননি, বরং সামান্য শুকনো মুড়ি খেয়ে কাটিয়েছেন দিন। তিনি কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্রের জন্য লড়াই করেননি, বরং সেই স্বাধীনতার ভেতর দিয়ে একটি শোষণমুক্ত সাম্যবাদী ও মানবিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

​স্বাধীনতার পর তাঁর সংগ্রাম থেমে থাকেনি; বরং তা এক নতুন মাত্রা লাভ করে। আশির দশকে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন বামপন্থী শক্তির অন্যতম মেরুদণ্ড। এছাড়া ভূমিহীন কৃষকদের অধিকার আদায় এবং শ্রমজীবী মানুষের রুটি-রুজির লড়াইয়ে তিনি রাজপথ থেকে শুরু করে নিজের লেখনীতে অবিরত সোচ্চার ছিলেন। সাংবাদিকতাকে নির্মল সেন কেবল পেশা নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী দার্শনিক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘ সময় ‘দৈনিক বাংলা’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও ক্ষমতার মোহ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে তাঁর লেখা ঐতিহাসিক কলাম—‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’—ছিল আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক চুক্তির এক নতুন ভাষ্য। রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের এই গভীর দাবিটি রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতাকে এক নিদারুণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।

আরও পড়ুন: মানবসম্পদের অপচয়-প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতা

​নির্মল সেনের রচিত গ্রন্থাবলী তাঁর প্রখর বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও নান্দনিক জীবনবোধের আয়না। তাঁর আত্মজীবনী 'আমার জবানবন্দী' কেবল এক ব্যক্তির কাহিনী নয়, বরং এটি বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ। 'লেনিন থেকে ক্রুশ্চেভ' গ্রন্থে তিনি সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের বিবর্তনকে যে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছেন, তা বিরল। তাঁর 'মানুষের সমাজ' ও 'রুশ-জাপান যুদ্ধ' গ্রন্থগুলোতে ফুটে ওঠে তাঁর গভীর তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা এবং ইতিহাসের অলিগলি চেনার অদ্ভুত ক্ষমতা। তাঁর গদ্য শৈলী ছিল অত্যন্ত ঝরঝরে কিন্তু এর অন্তরালে থাকত তীক্ষ্ণ শ্লেষ আর গভীর দর্শন। তিনি শব্দের কারুকার্যে এক ধরণের ‘নান্দনিক বাস্তববাদ’ তৈরি করতেন; যেখানে জীবনের রূঢ় সত্যগুলো কেবল শুষ্ক তথ্য হয়ে থাকে না, বরং সাহিত্যের সুষমায় তা পাঠকের হৃদয়ে এক গভীর মানবিক হাহাকার হয়ে ধরা দেয়। তিনি জানতেন কীভাবে ইতিহাসের কাঠখোট্টা দলিলকে মানুষের রক্ত-মাংসের গল্পের সাথে মিলিয়ে দিতে হয়। তাঁর প্রতিটি গ্রন্থই তাই কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং আগামী প্রজন্মের বিপ্লবীদের জন্য এক একটি গবেষণাধর্মী ম্যানিফেস্টো।

​নির্মল সেনের জীবনদর্শন ছিল আধুনিক ভোগবাদী রাজনীতির বিপরীতে এক নির্মোহ প্রাচীর। ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি আমৃত্যু ঢাকা প্রেস ক্লাবের ছোট্ট এক কক্ষে সাধারণ জীবনযাপন করে প্রমাণ করেছেন যে, মানুষের ভালোবাসা ও আদর্শের চেয়ে বড় কোনো সিংহাসন পৃথিবীতে নেই। তাঁর সেই ছোট্ট কক্ষে একটি সাধারণ তক্তপোশ আর বইয়ের স্তূপ ছাড়া আর কিছুই ছিল না—এই দৃশ্যটিই ছিল ক্ষমতার মদমত্ত রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর মৌন কিন্তু বজ্রকঠিন প্রতিবাদ। তাঁর এই নিস্পৃহ জীবনবোধ তাঁকে বিশ্ববরেণ্য সাংবাদিক জর্জ অরওয়েল বা অ্যালবার্ট কামুর মতো নির্ভীক বুদ্ধিজীবীদের কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়। বর্তমানের এই ডিজিটাল যুগে যখন সাংবাদিকতা করপোরেট স্বার্থের কাছে জিম্মি, তখন তাঁর সেই ‘গণমানুষের মুক্তি সংগ্রাম’ আমাদের নতুন করে পথ দেখায়। তিনি ছিলেন এই বদ্বীপের এক দার্শনিক স্থপতি, যিনি শব্দ আর সংগ্রামের ইটের ওপর গেঁথেছিলেন এক মুক্ত মানচিত্রের স্বপ্ন।

​২০১৩ সালের ৮ জানুয়ারি এই হিমালয়প্রতিম ব্যক্তিত্বের মহাপ্রয়াণ ঘটলেও তাঁর সত্তা মিশে আছে এই জনপদের প্রতিটি ধূলিকণায়। নির্মল সেন কেবল একজন মানুষ ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি জীবন্ত মানদণ্ড—যাঁর নির্মোহ জীবন বারেবারে আমাদের ক্ষুদ্রতাকে উপহাস করে যায়। তিনি প্রস্থান করেননি, বরং তাঁর সংগ্রামী দর্শন আজ এক প্রবহমান নদীর মতো মেহনতী মানুষের প্রতিটি মিছিলে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। মহাকালের বিশালতায় নশ্বর দেহের বিলয় ঘটলেও, মানুষের মুক্তির মিছিলে তিনি এক অবিনাশী ধ্রুবতারা। যতক্ষণ পৃথিবীতে বৈষম্য থাকবে, যতক্ষণ মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই জারি থাকবে, ততক্ষণ নির্মল সেন বেঁচে থাকবেন প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের অকুতোভয় অস্তিত্বে—এক চিরকালীন আলোকবর্তিকা হয়ে।

লেখক: (ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)