আল-জাজিরার প্রতিবেদন

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কী? তারা কি আগামী দিনে দেশ শাসন করতে পারে?

Sadek Ali
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:১৪ অপরাহ্ন, ২১ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১২:১৪ অপরাহ্ন, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

জীবনে প্রথমবারের মতো মনে করছেন, নিজের সমর্থিত রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার বাস্তব সুযোগ পেয়েছে—বলছিলেন ফরিদপুরের ৪৫ বছর বয়সী ব্যাংকার আবদুর রাজ্জাক। নিজ এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে তিনি বলেন, মানুষ এবার ঐক্যবদ্ধভাবে জামায়াতকে ভোট দিতে চায়।

বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এটি হবে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর প্রথম নির্বাচন।

আরও পড়ুন: গণমানুষের স্বাস্থ্যসেবায় বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: ডা. রফিকুল ইসলাম

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করায় এবারের নির্বাচন কার্যত দ্বিমুখী প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। একদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রনেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) সহ কয়েকটি ইসলামী দলের জোট।

জরিপে ব্যবধান কমছে

আরও পড়ুন: ধর্মের অপব্যবহার করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেস্টা আইনত অপরাধন: মাহ্দী আমিন

সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো জামায়াতের উত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের ডিসেম্বরের জরিপে বিএনপির সমর্থন ৩৩ শতাংশ এবং জামায়াতের ২৯ শতাংশ পাওয়া যায়।

এর পর গত সপ্তাহে ন্যারেটিভ, প্রজেকশন বিডি, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি ও জাগরণ ফাউন্ডেশনের যৌথ জরিপে বিএনপি ৩৪.৭ শতাংশ এবং জামায়াত ৩৩.৬ শতাংশ সমর্থন পায়।

এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে কঠোর দমন-পীড়নের শিকার হওয়া দলটির জন্য এটি হবে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন।

দমন-পীড়নের দীর্ঘ অধ্যায়

শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ ছিল। দলটির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হয়, অনেকে কারাবন্দি হন এবং হাজারো নেতা-কর্মী গুম বা হেফাজতে মৃত্যুর শিকার হন।

২০১০ সালে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াত নেতাদের বিচার করা হয়—যা মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছিল।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে সহিংসতার অভিযোগে একই ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। ইউনূস সরকারের অনুরোধ সত্ত্বেও এখনো তাকে প্রত্যর্পণ করেনি নয়াদিল্লি।

জামায়াতের ইতিহাস ও রাজনৈতিক উত্থান

১৯৪১ সালে ইসলামি চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান সরকার ১৯৭২ সালে দলটি নিষিদ্ধ করে।

১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলে জামায়াত রাজনীতিতে ফিরে আসে। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে অংশ নেয় এবং মন্ত্রিসভায়ও প্রতিনিধিত্ব পায়।

তবে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় ফেরার পর দলটির রাজনৈতিক প্রভাব আবার সংকুচিত হয়ে পড়ে।

২০২৪–এর পর নতুন বাস্তবতা

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর জামায়াত নতুন করে সংগঠিত হয়েছে। বর্তমানে দলের নেতৃত্বে রয়েছেন আমির ডা. শফিকুর রহমান, নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং মহাসচিব মিয়া গোলাম পরওয়ার।

জামায়াত নেতাদের দাবি, দলটির প্রায় ২ কোটি সমর্থক এবং আড়াই লাখ নিবন্ধিত সদস্য রয়েছে। ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে সাফল্য পাওয়ায় দলের সাংগঠনিক শক্তি আরও দৃশ্যমান হয়েছে।

ইসলামি দল ক্ষমতায় এলে উদ্বেগ?

জামায়াতের উত্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—ইসলামি দল ক্ষমতায় এলে কি শরিয়াহ আইন বা নারীর অধিকার সীমিত হবে?

জামায়াত নেতৃত্ব এসব আশঙ্কা নাকচ করে বলছে, তারা সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই সংস্কারভিত্তিক শাসন চালাতে চায়।

প্রথমবারের মতো দলটি একজন হিন্দু প্রার্থী—কৃষ্ণ নন্দীকে খুলনা থেকে মনোনয়ন দিয়েছে, সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে।

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক আসিফ বিন আলী বলেন,

বাংলাদেশি ভোটাররা ধর্মপ্রাণ হলেও রাজনৈতিকভাবে বাস্তববাদী। ইসলামপন্থার উত্থান মানেই ইসলামি রাষ্ট্র চাওয়া—এটা বলা যায় না।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিয়ান বলেন, “জামায়াত এবার তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে পারে, তবে এককভাবে ক্ষমতায় আসা এখনো কঠিন।”

এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুশতাক খান মনে করেন, “এই নির্বাচন ইসলাম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতার নয়, বরং সংস্কার বনাম পুরোনো ব্যবস্থার লড়াই।”

আঞ্চলিক কূটনীতিতে প্রভাব?

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত ভালো ফল করলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ আরও জোরদার হতে পারে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু একটি ভোট নয়—এটি নির্ধারণ করবে, দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থানে থাকা একটি দল কি জাতীয় নেতৃত্বে পরিণত হতে পারে কিনা।