মৌলভীবাজারে কফি উৎপাদনে সফলতা

Sadek Ali
আতাউর রহমান কাজল, শ্রীমঙ্গল
প্রকাশিত: ১:৪০ অপরাহ্ন, ২১ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১:২২ অপরাহ্ন, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

মৌলভীবাজারে কফি চাষের জন্য কৃষি বিভাগ উদ্যোগ গ্রহন করেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কৃষি অধিদপ্তর বিনামুল্যে কফির চারাও বিতরণ করেছে। কৃষি বিভাগ বলছে, জেলার পাহাড়ি ও সমতল ভূমিতে কফির দুটি জাত- ‘এরাবিকা’ ও ‘রোবাস্টা’ পরীক্ষামূলক চাষে ভালো ফলাফল পাওয়া গেছে। ফলে চায়ের পাশাপাশি এ অঞ্চলে কফি চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

মৌলভীবাজার কৃষি অধিদপ্তর সুত্র জানায়, মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলা, রাজনগর ও শ্রীমঙ্গলে বিভিন্ন পাহাড়ি ও সমতলে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় দুই হাজার কফির চারা বিতরন করা হয় ২০২১-২০২২ অর্থবছরে। ওইসব স্থানে কফির বাগানও সৃজন  করা হয়। বর্তমানে এসব বাগানে কফির ভালো ফলাফল পাওয়া গেছে। বর্তমানে কফি বাগানগুলোতে লাল টকটকে কফি ফল শোভা পাচ্ছে। 

আরও পড়ুন: আশুলিয়ায় সাংবাদিক পরিচয়ে শ্রমিক নেতাদের মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ

শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন চা বিজ্ঞানী জানান, এখানকার আবহাওয়া, মাটি, জলবায়ু চা, রাবার, লেবু, আনারস, কাঠাল ও কফি চাষের উপযোগী। তিনি বলেন, কফি চায়ের মতো একটি দীর্ঘজীবী উদ্ভিদ। তাই চায়ের অনুরুপ কফির ফলনও খুব  ভাল হতে পারে এ অঞ্চলে। যে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমান বেশি সে মাটিতে কফি চাষ উপযোগী।

সুত্র জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তথা বাংলাদেশে বর্তমানে কফি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। বড় বড় হোটেলগুলোতে কফির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

আরও পড়ুন: পাচারচক্রের হাত থেকে শিশু উদ্ধার, পাচারকারী নারী গ্রেফতার

সরকারি প্রণোদনাসহ প্রকল্প আকারে মৌলভীবাজার জেলায় কফির চাষ করলে এ অঞ্চলের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে যেমন লাভবান হবে তেমনি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও  রপ্তানি করে সরকারও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং আকবরপুর কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কফি চাষ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। কৃষকদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন জায়গায় বিনামূল্যে চারা বিতরণ ও অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আকবরপুরের কৃষক আব্দুল মান্নান জানান, তার কফি বাগানে বর্তমানে ১,৮০০ কফি গাছ রয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি কয়েক দফা ফলন পেয়েছেন এবং লক্ষাধিক টাকার কফি ফল বিক্রি করেছেন। তিনি আশাবাদী, আগামী বছর ফলন ও লাভ দুই-ই আরও বাড়বে।

শ্রীমঙ্গলের ডলুছড়ার আতর আলীর ৫০ শতক বাগানে রয়েছে প্রায় ৩০০ কফি গাছ। তিনি ইতোমধ্যে ২-৩ বার ফলন পেয়েছেন এবং ৫০  হাজার টাকার কফি বিক্রি করেছেন।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক নিলুফার ইয়াসমিন মোনালিসা সুইটি জানান, শ্রীমঙ্গলের জাগছড়া চা বাগানে তিনি ২০০ চারা দিয়েছেন। সেখানে ইতোমধ্যে কফি চাষ শুরু হয়েছে। আকবরপুর কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট থেকেও জাগছড়া বাগানে কফির চারা দেয়া হয়েছে এবং বাগান সৃজন করা হয়েছে। 

এছাড়া রাজনগরের উত্তরবাগ চা বাগানের সিনিয়র ম্যানেজার মো. লোকমান চৌধুরী বলেন, গত বছরের শেষ দিকে তাদের বাগানে ৩,৫০০ কফির চারা রোপণ করে নতুন কফি বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। কফি প্রক্রিয়াজাতকরনের জন্য প্রসেসিং প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন তারা।

নিলুফার ইয়াসমিন মোনালিসা সুইটি আরও বলেন, মৌলভীবাজার জেলার পাহাড়ি ও টিলা সমৃদ্ধ এলাকা কফি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানকার আবহাওয়া ও জলবায়ু কফির জন্য অনুকূল হওয়ায় বাণিজ্যিক সম্ভাবনা অনেক। ইতোমধ্যে এ জেলায় কফি চাষ সম্প্রসারণের জন্য একটি প্রস্তাব উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি চাষিদের প্রশিক্ষণ, মানসম্মত চারা এবং প্রক্রিয়াজাতকরন সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে মৌলভীবাজার আগামী দশকের মধ্যে কফি উৎপাদনে দেশের শীর্ষ অবস্থানে যেতে পারবে। এতে শুধু কৃষকের আয়ের উৎস বাড়বে না, পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এছাড়াও যদি মৌলভীবাজার জেলায় পরিকল্পিতভাবে কফি চাষ বিস্তৃত করা যায়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই এ জেলার কফি স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানী উপযোগী হতে পারে। 

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৌলভীবাজার শুধু চা নয়, কফির ক্ষেত্রেও দেশের শীর্ষ উৎপাদনকারী এলাকায় পরিণত হতে পারে। কৃষকের স্বপ্ন আর সরকারি উদ্যোগ মিলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এখানকার কফি হতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিযোগ্য একটি নতুন কৃষিপণ্য। আর প্রয়োজন একটি প্রসেসিং প্লান্ট।