টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ে মৃত্যু ফাঁদ: চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে তিন দিনে প্রাণ গেল অন্তত ২০ জনের
টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাহাড় ধস একের পর এক প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। গত তিন দিনে দুই জেলায় অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই শিশু ও রোহিঙ্গা শরণার্থী। পাহাড় ধসে ঘরবাড়ি চাপা পড়া, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ধসে হতাহতের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা, সড়ক ও রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, চট্টগ্রামে গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।
টানা দুই থেকে তিন দিনের ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। পাহাড় ধস, জলাবদ্ধতা এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে দুর্ভোগে পড়েছেন লাখো মানুষ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবার এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
আরও পড়ুন: বঙ্গোপসাগরে ট্রলার ডুবি: ১১ জেলে উদ্ধার, নিখোঁজ ২
বুধবার চট্টগ্রামে পৃথক দুটি পাহাড় ধসের ঘটনায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সকাল ১০টার দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড় ধসে একটি কাঁচা ঘর মাটিচাপা পড়ে। এতে ঘরের ভেতরে থাকা ১০ মাস বয়সী শিশু মো. আশরাফুল ইসলাম তানভীর ঘটনাস্থলেই মারা যায়।
আরও পড়ুন: বৃষ্টিতে ঘরের মেঝেতে জমে থাকা পানিতে ডুবে ৮ মাসের শিশুর মৃত্যু
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. জুনায়েত কাউছার জানান, টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ঘরের ওপর ধসে পড়ায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
একই দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর পাঁচলাইশ থানার মেয়র গলি এলাকার চশমা হিলে আবারও পাহাড় ধস নামে। পাহাড়ের একটি বড় অংশ বাবু কলোনির দুটি ঘরের ওপর ভেঙে পড়ে। ধ্বংসস্তূপ থেকে ১১ বছর বয়সী সামিয়া আক্তারকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক রিয়াদুস সালেহীন জানান, এ ঘটনায় অন্য কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে একই দিনে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। দুপুর আড়াইটার দিকে ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি মাদরাসার ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। দুর্যোগকালীন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত ওই মাদরাসায় তখন অনেক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছিলেন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আহত অবস্থায় অন্তত দুজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে কতজন এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বহু রোহিঙ্গা ওই মাদরাসায় অবস্থান করছিলেন। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর আগে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও কক্সবাজারে দেয়াল ও পাহাড় ধসে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়।
কক্সবাজারেও গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সোমবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে আটজন, কক্সবাজার শহর ও পেকুয়ায় দুজন এবং মঙ্গলবার শহরের আরেকটি পাহাড় ধসে একজনের মৃত্যু হয়। এছাড়া বৃষ্টির পানিতে ডুবে এক রোহিঙ্গা শিশুসহ আরও দুই শিশুর প্রাণহানি ঘটে।
সব মিলিয়ে কক্সবাজার জেলায় গত তিন দিনে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ১৩ জনে। আর বুধবারের দুই শিশুসহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার মিলিয়ে তিন দিনে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২০ জনে পৌঁছেছে।
এদিকে টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। নিচু এলাকার বহু বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। বেশ কয়েকটি এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে এবং লাইনের ক্ষতির আশঙ্কায় ট্রেন চলাচলও বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ১০টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড করা হয় ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, এটি গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। এর আগে ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ৪১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল।
অন্যদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মাত্র ছয় ঘণ্টায় ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পাহাড় ধস, জলাবদ্ধতা এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ পুনর্বাসনে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।





